জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ষাটের দশকে প্রমত্তা কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিলে সৃষ্টি হয় কাপ্তাই হ্রদের। প্রায় ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর আয়তনের বিশালাকার এ জলাধার এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্বাদু পানিতে মাছ চাষের বৃহৎ ক্ষেত্র। বিশাল ভূমিকা রাখছে দেশের মৎস্যসম্পদ উৎপাদনে। একটা সময়ে হ্রদে বড় প্রজাতি কিংবা কার্পজাতীয় মাছের উল্লেখজনক উৎপাদন হলেও কালের বিবর্তনে এখন বেড়ে ওঠে ছোট প্রজাতির মাছ। আর এ ছোট মাছের ক্ষেত্রটিই এখন সরকারের বড় আয়ের খাত।

রাঙ্গামাটির আট ও খাগড়াছড়ির দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ। এটির রক্ষণাবেক্ষণ ও মাছ চাষের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রজাতিভিত্তিক মৎস্য বিবরণীতে কাপ্তাই হ্রদ থেকে ছোট-বড় মোট ৪৪ প্রজাতির মাছ আহরণের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ২৭ প্রজাতি বড় মাছ ও ১৭ প্রজাতির রয়েছে ছোট মাছ। তবে আহরিত মাছের মধ্যে ছোট মাছের আধিক্যই বেশি। যে কারণে কাপ্তাই হ্রদ থেকে বিএফডিসির বেশি শুল্ক আয় হচ্ছে এসব প্রজাতির মাছ থেকেই।

বিএফডিসি রাঙ্গামাটি বিপণনকেন্দ্রের বাজারজাতকরণ কর্মকর্তা মো. শোয়েব সালেহীন বণিক বার্তাকে বলেন, বিএফডিসির শুল্ক আদায়ের বেশির ভাগই হয়ে থাকে ছোট প্রজাতির মাছ থেকে। বিশেষত কাচকি, চাপিলা ও মলাসহ অন্যান্য ছোট মাছের আধিক্য রয়েছে কাপ্তাই হ্রদে।

বার্ষিক মৎস্য অবতরণ ও শুল্ক আদায়ের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছে, বিএফডিসির রাঙ্গামাটির প্রধান বিপণনকেন্দ্র, কাপ্তাই, মহালছড়ি ও মারিশ্যা—এ চার অবতরণকেন্দ্রে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭ হাজার ৬০৭ টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ হাজার ৯৫৩ টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮ হাজার ১০৪ টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬ হাজার ৪৫৫ টন ও সবশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ হাজার ১৫৪ টন মাছ আহরণ করেছে। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বড় প্রজাতি কেবল ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও ছোট মাছ ৯২ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বড় প্রজাতি ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ ও ছোট মাছ ৯৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বড় প্রজাতি ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ ও ছোট মাছ ৯৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে বড় প্রজাতি ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ ও ছোট মাছ ৯৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে বড় প্রজাতি ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ ও ছোট মাছ ৯৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর এ পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১২ কোটি ৪২ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১২ কোটি ৭৮ লাখ, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৫ কোটি ৩৬ লাখ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১২ কোটি ৩৬ লাখ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা শুল্ক বা রাজস্ব আদায় করেছে বিএফডিসি; যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে ছোট প্রজাতির মাছ থেকে। যদিও কাপ্তাই হ্রদে কার্পজাতীয় বা বড় প্রজাতির মাছের আধিক্য বাড়াতে প্রতি বছরই নিয়মতান্ত্রিকভাবে মাছের পোনা ছেড়ে যাচ্ছে সরকার। নানা উদ্যোগের পরও বড় মাছের উৎপাদন কমছেই।

বিএফডিসি রাঙ্গামাটির ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. তৌহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, কাপ্তাই হ্রদে বড় প্রজাতির কিংবা কার্পজাতীয় মাছের উৎপাদন বাড়াতে বিএফডিসি আন্তরিকভাবেই কাজ করছে। ক্রমাগতই অবমুক্ত করা হয়েছে বড় মাছের পোনা। আমাদের নিজস্ব হ্যাচারিতেও পোনা উৎপাদন করে যাচ্ছি। সবশেষ এ মৌসুমে আমরা রেকর্ডসংখ্যক পোনা অবমুক্ত করেছি। যদিও অনেকেরই অভিযোগ, লেকে বড় মাছ নেই। কিন্তু বিষয়টি সঠিক নয়। সাধারণত লেক থেকে আহরিত বড় মাছগুলো স্থানীয় বাজারে চলে যায়। তবে চেঙ্গী ও রীংক্ষ্যং চ্যানেলে এখন আর প্রাকৃতিক প্রজনন হচ্ছে না।