পানিস্বল্পতার মধ্য দিয়েই শুরু আহরণ মৌসুম। ফলে মৌসুমের শুরুর দিকে কাপ্তাই হ্রদে স্বল্প পানির কারণে মাত্রাতিরিক্ত মাছ ধরা পড়ে, কিন্তু মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই মাছের আহরণ উল্লেখজনক হারে কমে গেছে। হ্রদের মাছ আহরণ কমায় বিপাকে পড়েছেন জেলে ও ব্যবসায়ীরা। মাছ আহরণ কমতির ফলে বিএফডিসির বার্ষিক মৎস্য অবতরণের লক্ষ্যমাত্রায় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এ কারণে রাজস্ব আয় নিয়েও শঙ্কা জাগিয়েছে। কাপ্তাই হ্রদের আহরণকৃত মাছের ওপর বার্ষিক ১৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আদায় হয়েছে এখন পর্যন্ত মাত্র সাড়ে ৯ কোটি টাকা। আবার সাড়ে ৯ কোটি টাকার মধ্যে ৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে নিয়মিত খরচে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রকে তাগাদা দিয়েছে মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) এক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির অধীন কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণন কেন্দ্রকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বার্ষিক আয় অর্জনে নির্দেশনা দিয়েছে। বিএফডিসির হিসাব নিয়ন্ত্রক মো. রাজিবুল আলমের স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণন কেন্দ্র রাঙ্গামাটি কেন্দ্রের ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২২ আয়-ব্যয় প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কেন্দ্রের বার্ষিক রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১৯ কোটি সাড়ে ৬৭ লাখ টাকার বিপরীতে প্রথম ছয় মাসে কেন্দ্রে রাজস্ব আয় হয়েছে ৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা মাত্র, যা বার্ষিক রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার শতকরা ৪৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ অর্জন মাত্র। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব অর্জন তুলনামূলক অনেক কম। অন্যদিকে কেন্দ্রের একই সময়ে ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি টাকা। ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত কেন্দ্রের অপারেশনাল লাভ হয়েছে ৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা মাত্র। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেন্দ্রের বার্ষিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আয় অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে ওই চিঠিতে।
বিএফডিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিএফডিসি রাঙ্গামাটি বিপণনকেন্দ্রের নয় হাজার টন মাছ অবতরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে গত বছরের ১৮ আগস্ট থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ মাসের অধিক সময়ে ৪ হাজার ৭০৯ টন মাছ বিএফডিসি রাঙ্গামাটির চারটি অবতরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে বাজারজাত করা হয়েছে, যা বিএফডিসির মোট অবতরণ লক্ষ্যমাত্রার ৫২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। মূলত প্রতি অর্থবছরের আগস্ট থেকে পরের বছরের এপ্রিল পর্যন্ত নয় মাসকে মাছ আহরণের মৌসুম ধরা হয়, কিন্তু গত সাড়ে পাঁচ মাসে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক মাছ পাওয়া গেলেও বাকি তিন মাসে অবতরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘মৌসুমের প্রথম দিকে হ্রদে আশানুরূপ মাছ আহরিত হলেও শেষের দিকে পানিস্বল্পতা ও মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে মাছ আহরণে ভাটা পড়ে। সে কারণে বিএফডিসির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এবারের মাছ আহরণ হবে না। রাঙ্গামাটি জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক উদয়ন বড়ুয়া বলেন, ‘পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কাপ্তাই হ্রদে মাছের উৎপাদন বাড়ে না। যে কারণে মৌসুমের শুরুর দিকে মাত্রাতিরিক্ত মাছ আহরণ হওয়ায় শেষের দিকে ভাটা পড়ে। এছাড়া আগের চেয়ে বর্তমানে জেলে পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। মৌসুম শুরুতে প্রতিদিন ১৫-২০টি মাছবাহী ট্রাক রাজধানীর উদ্দেশে ছেড়ে গেলেও বর্তমানে চার-পাঁচটি মাছ নিয়ে যাচ্ছে। মাছ উৎপাদনের জৌলুস ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনে বছরে দুবার মাছ আহরণ বন্ধ রাখা দরকার।’
কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লেফট্যানেন্ট কমান্ডার মো. তৌহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, কাপ্তাই হ্রদের পানির পরিমাণ আশঙ্কাজনক কমে যাচ্ছে।এতে করে মাছ আহরণেও ভাটা পড়ছে। এভাবে পানি কমতে থাকলে পুরো এপ্রিল পর্যন্ত মাছ আহরণ চালু রাখা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা আছে। যদি বৃষ্টিপাত হয় তাহলে অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে, অন্যথায় শঙ্কা রয়েছে।
মাছ অবতরণ ও রাজস্ব আয় প্রসঙ্গে ব্যবস্থাপক বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় আমাদের ৪০ টন মাছ কম অবতরণ হয়েছে, তবে ইদানিং অবতরণ কিছুটা বাড়ছে। আমাদের বার্ষিক অবতরণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে রাজস্ব আয় অর্জন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’
প্রসঙ্গত, দেশের বৃহত্তম বদ্ধ জলাশয়ের মধ্যে অন্যতম কাপ্তাই হ্রদের আয়তন প্রায় ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর। ষাটের দশকে রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দেয়ায় বিশাল কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়। প্রতি বছরের ১ মে-৩১ জুলাই পর্যন্ত তিন মাস হ্রদে কার্পজাতীয় মাছের প্রজনন ও অবমুক্ত করা পোনা মাছের সুষম বৃদ্ধি নিশ্চিত করাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। নিষেধাজ্ঞা শেষে আগস্ট থেকে শুরু হয় মাছ আহরণের নতুন মৌসুম, যা শেষ হয় পরবর্তী বছরের এপ্রিলে। মূলত প্রতি মৌসুমে নয় মাসই মাছ আহরণ করা হয়ে থাকে কাপ্তাই হ্রদে। রাঙ্গামাটির আট উপজেলা ও খাগড়াছড়ির দুই উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত এ কাপ্তাই হ্রদে সরকারি হিসাবে প্রায় ২৫ হাজার নিবন্ধিত জেলে পরিবার মাছ ধরাসহ সংশ্লিষ্ট পেশায় জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এ হ্রদের সৃষ্টি হলেও এটি বর্তমানে সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস্য।










