গত বছর বন্যায় কমলগঞ্জ-আদমপুর সড়কে তৈরি হয়েছে বড় বড় খানাখন্দ। এতে এ সড়কে চলাচলে দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বাড়ছে দুর্ঘটনাও। বেহাল রাস্তার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম ও স্থানীয় কৃষি। বেড়েছে পণ্য পরিবহন ব্যয়।

স্থানীয় যাত্রী ও চালকরা জানান, কমলগঞ্জ-আদমপুর সড়কটিতে অন্তত ১০ বছর আগে উন্নয়নকাজ হয়েছিল। কয়েক বছর ধরে রাস্তাটি বেহাল। বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে বিভিন্ন স্থানে, যার কারণে দুর্ভোগ পোহান যাত্রী ও চালকরা। সড়কের বুক থেকে পিচ উঠে তৈরি হয়েছে অসংখ্য গর্ত। নিরাপদে গাড়ি চালাতে চালককে যেমন সতর্ক থাকতে হচ্ছে, তেমনি যাত্রীরা সারাক্ষণই ঝাঁকুনির মধ্যে থাকেন। মাঝেমধ্যে গর্তে কিছু ইটের খোয়া ও বালি ফেলা হচ্ছে। কিন্তু তাতে দুর্ভোগের তেমন একটা হেরফের হচ্ছে না। কারণ বৃষ্টিতে তা সরে গিয়ে আবার গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। যাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি গন্তব্যে পৌঁছতে সময় ও ভাড়া বেশি লাগছে। ভোগান্তির পাশাপাশি প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কমলগঞ্জ-আদমপুর সড়কের মাটিয়া মসজিদ এলাকায় ভাঙাচোড়া রাস্তার পাশে একটি সাইনবোর্ড ঝুলছে। সাইনবোর্ডে লেখা ‘দয়া করে আস্তে গাড়ি চালান। এ জায়গায় অ্যাকসিডেন্টে আমার ভাইকে হারিয়েছি।’ সাইনবোর্ডটি লাগিয়েছেন কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের প্রবাসী মো. মুত্তালিব ভক্ত। কানাডার টরন্টোতে বসবাসকারী মুত্তালিব ভক্ত জানান, বছর দেড়েক আগে খানাখন্দে ভরা এ স্থানে সিএনজি অটোরিকশা দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন সহোদর রুহেল ভক্তকে। আর যাতে কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, এজন্য এ সতর্কবার্তা লিখে দিয়েছেন। এলাকাবাসীর মতো রাস্তাটি দ্রুত মেরামতের দাবি জানান তিনি।

জানা যায়, কমলগঞ্জ-আদমপুর সড়কটি শেষ হয়েছে কুরমা সীমান্তে। হামহাম জলপ্রপাত যেতে হয় এ সড়ক ধরে। আদমপুর ও সীমান্তবতী ইসলামপুর, মাধবপুর ইউনিয়নের লাখো মানুষ চলাচল করে এ সড়ক দিয়ে। মৌলভীবাজার জেলা শহরসহ বাইরের যোগাযোগের একমাত্র সড়ক এটি। এ এলাকাটি জেলার কৃষি হাব হিসেবে পরিচিত। এখানে উৎপাদিত কৃষিপণ্য মৌলভীবাজার ছাড়াও আশপাশের অনেক জেলায় সরবরাহ হয়। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন গ্রাফটিং টমেটো চাষ ও টমেটো চারার জন্য এ এলাকা বিখ্যাত। কারণ গ্রাফটিং টমেটো চাষের শুরু এখানকার কৃষকদের হাত ধরে। এছাড়া এ অঞ্চলের শীতকালীন সবজির চাহিদাও ব্যাপক। এখানকার কয়েক হাজার মানুষ কৃষির সঙ্গে জড়িত।

35

স্থানীয় কৃষকরা জানান, রাস্তা মেরামত না হওয়ায় বেড়েছে পণ্য পরিবহন ব্যয়। আবার পরিবহনে সময় লাগে দ্বিগুণ। অনেক স্থানে অবস্থা এতটা খারাপ, যেখানে গাড়ি চলার অবস্থা নেই। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এখানকার কৃষি ও কৃষকদের ওপর।

মনিপুরি তাঁত শিল্পের আঁতুড় ঘর এ এলাকা। দেশের অধিকাংশ মনিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষ এ এলাকায় বসবাস করেন। যাদের অনেকে তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত। প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার তাঁতবস্ত্র এ এলাকা থেকে সরবরাহ করা হয়। এখানকার তাঁত শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপরও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভাব পড়েছে।

২০১৮ সালে কমলগঞ্জের মনিপুরি নৃগোষ্ঠীর ১০টি পরিবারকে যুক্ত করে সিলেট বিভাগের প্রথম কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম যাত্রা শুরু করে। সেই পাইলট প্রকল্প ব্যাপক সাড়া পায়। কিন্তু ভাঙাচোড়া রাস্তার কারণে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও।

মনিপুরি কমিউনিটি ট্যুরিজমের পরিচালক নিরঞ্জন সিংহ রাজু জানান, প্রকল্পটি চালুর দুই বছরের মাথায় দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় এবং পর্যটন কেন্দ্রের পাশাপাশি বন্ধ হয় এ প্রকল্পটি। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম। মনিপুরিদের ঋতুভিত্তিক আচার বিষু, চৈরাউবা, রথযাত্রা, কাঙ এবং বৃহত্তম উৎসব রাসপূর্ণিমাসহ অন্যান্য উৎসবের প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ থাকায় সারা বছরই এ পর্যটন সুবিধা চালু রাখা হয়েছে। দেশী পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশী অতিথিরাও নিয়মিত আসেন। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় পর্যটকরাও দুর্ভোগে পড়েন। একবার যারা আসেন তারা দ্বিতীয়বার আর আসতে চান না। এজন্য ক্ষতির মুখে পড়েছে কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম।

সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক কবির মিয়া বলেন, ‘‌এ সড়কে গাড়ি চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে থাকি। রাস্তার মাঝে বড় বড় গর্তে ভারসাম্য রাখা খুব কঠিন। মাঝে মাঝে ইট বিছানো হয়েছে, এতে আরো সমস্যা বেড়েছে। গাড়ি ঝাঁকুনি খেয়ে নাট-বল্টু সব ঢিলা হয়ে যায়। সড়কের এ অবস্থার কারণে এখন প্রতি সপ্তাহে গাড়িতে কাজ করাতে হচ্ছে, যা আয় হয় তার একটা বড় অংশ চলে যায় গাড়ি মেরামত কাজে।’

এ সড়ক দিয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারী আলতাফ মাহমুদ বাবুল বলেন, ‘‌রাস্তার অবস্থা অনেকদিন ধরেই খারাপ। বাধ্য হয়ে এখান দিয়ে আসা যাওয়া করতে হচ্ছে। খারাপ রাস্তার কারণে আমাদের কষ্ট হয়। বাড়তি সময় ও ভাড়া গুনতে হয়।’

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) জানায়, কমলগঞ্জ-আদমপুর রাস্তাটির দৈর্ঘ্য সাড়ে ৮ কিলোমিটার। সড়কটি শেষ হয়েছে কুরমা সীমান্তে। রাস্তাটি সংস্কারে একটি প্রকল্প এরই মধ্যে তৈরি করা হয়েছে। প্রতি কিলোমিটার সড়ক মেরামতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি টাকা।

প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আব্দুল্লা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমরা অস্থায়ীভাবে রাস্তাটি মেরামত করে যানবাহন চলাচলের উপযোগী রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু গত বছরের বন্যায় বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, যা অস্থায়ীভাবে সংস্কার সম্ভব নয়। এজন্য প্রকল্পের মাধ্যমে বড় সংস্কার করতে হবে। খুব দ্রুত কাজ করা যাবে আশা করছি।’