কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুগাছ-পাত্রখোলা সড়কটির দৈর্ঘ্য ১৩ কিলোমিটার। এ সড়ক দিয়ে জেলার অন্যতম পর্যটন স্পট মাধবপুর লেক, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের সমাধি, হামহাম জলপ্রপাত ও মণিপুরি পল্লীতে প্রতিদিন যাতায়াত করে কয়েকশ পর্যটক। কিন্তু সড়কের বিভিন্ন স্থানে উঠে গেছে পিচ, খোয়া এবং ইট বেরিয়ে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য খানাখন্দ। ভাঙাচোরা সড়কে চলাচলে বাড়তি সময় লাগছে, গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।
এ চিত্র শুধু কমলগঞ্জের নয়, মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা, কুলাউড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন ৬০০ কিলোমিটার সড়কের এমন নাজুক অবস্থা। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দুর্ভোগে পড়ছে জেলায় ঘুরতে আসা পর্যটকরাও। ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছে পর্যটন ও মণিপুরি শিল্পসহ স্থানীয় বাণিজ্য। প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও।
এলজিইডির তথ্যমতে, মৌলভীবাজার জেলায় তাদের আওতাধীন সড়ক রয়েছে ১ হাজার ৯২৭টি। এসব সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ৫ হাজার ১৪৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে পাকা সড়ক ২ হাজার ২৭ কিলোমিটার এবং কাঁচা সড়ক ৩ হাজার ১২০ কিলোমিটার। পাকা সড়কের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিভিন্ন পর্যায়ে মেরামতযোগ্য।
জানা গেছে, রাস্তাঘাটের দুরবস্থা জেলার পর্যটনসমৃদ্ধ উপজেলা শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে পর্যটকদের যাতায়াতে বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করছে। শুধু পর্যটন এলাকা নয়, জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামীণ জনপদের সড়কেও খানাখন্দ এবং পিচ উঠে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে। এসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কর্মজীবীসহ কয়েক হাজার মানুষ চলাচল করে। অভিযোগ রয়েছে, ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে পণ্য পরিবহনে বাড়তি ভাড়া নেয়া হয়। সড়কে গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে যানবাহন ধীর গতিতে চালাতে হয়। কোথাও কোথাও ঝুঁকি নিয়ে চলে যানবাহন।
মৌলভীবাজারের কৃষি অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে পর্যটন খাতের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আয় করেন। তারা মনে করেন, পর্যটন কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগকারী সড়কগুলোর দুরবস্থা পর্যটকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পর্যটন এলাকার সড়কগুলো সংস্কার করা জরুরি।
সম্প্রতি কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর লেকে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন পর্যটকের সঙ্গে। তারা জানান, এখানকার প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক মান সন্তোষজনক। কিন্তু বেহাল রাস্তার কারণে বাড়তি সময় লেগেছে। যার কারণে নির্ধারিত সময়ে সব স্থান ঘুরে দেখা সম্ভব হয়নি। ভাঙা রাস্তার অজুহাতে বাড়তি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ করেন তারা।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংঘের সাংগঠনিক সম্পাদক এসকে দাস সুমন বলেন, ‘আমরা সবসময় রাস্তাঘাট উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। এ অবস্থার উন্নতি না হলে পর্যটকরা এখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।’
কমলগঞ্জের আদমপুর, ইসলামপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের এলাকাগুলো জেলার কৃষি হাব হিসেবে পরিচিত। এখানে উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য মৌলভীবাজার ছাড়াও আশপাশের অনেক জেলায় সরবরাহ হয়। স্থানীয় কৃষকরা জানান, রাস্তাঘাট মেরামত না হওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।
আবার মণিপুরি তাঁত শিল্পের আঁতুড়ঘর এ এলাকা। দেশের অধিকাংশ মণিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষ এ এলাকায় বসবাস করে। যাদের অনেকে তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাঁতশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার তাঁতবস্ত্র এখান থেকে সরবরাহ করা হয়। তবে এ শিল্পে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভাব পড়েছে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে কমলগঞ্জের মণিপুরি নৃগোষ্ঠীর ১০ পরিবারকে যুক্ত করে সিলেট বিভাগে প্রথম কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম যাত্রা শুরু হয়। সে পাইলট প্রকল্প ব্যাপক সাড়া পায়। কিন্তু ভাঙাচোরা রাস্তাঘাটের কারণে পর্যটকরা ক্রমেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের ৬০০ কিলোমিটারের সড়ক মেরামতযোগ্য। বর্তমানে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ১৯৪ কিলোমিটার রাস্তার উন্নয়নকাজ চলমান আছে। মেরামত কর্মসূচির আওতায় চলতি বছর আরো ৮০ কিলোমিটার রাস্তা প্রস্তাবে আছে। তবে সেটি প্রয়োজনের তুলনায় কম। দ্রুত বরাদ্দ এনে কাজ করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। বিশেষ করে পর্যটনসংশ্লিষ্ট সড়কগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে মেরামত করা হবে।’ কিছু সড়কের জন্য টেন্ডার দেয়া হয়েছিল, সেগুলোতেও ঠিকাদার সময়মতো কাজ করছেন না বলে জানান তিনি।










