চট্টগ্রামে বিগত বছরগুলোয় সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সমাপ্ত অর্থবছরে কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৫৯৪ টন মাছ সমুদ্র থেকে আহরণ করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৯৭৫ টন কমে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ১৯ হাজার ৬১৯ টন। বছরের ব্যবধানে মাছ আহরণ কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে সমুদ্রের ইলিশে। সমুদ্র থেকে ইলিশ আহরণও ৯৪৩ টন কমেছে বিদায়ী বছরে। মূলত চোরাই নৌযান নিয়ন্ত্রণ, চাহিদা অনুযায়ী মাছ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, বাণিজ্যিক পরিকল্পনার কারণে মাছ আহরণ কিছুটা কমেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর চট্টগ্রামের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ছোট নৌযানের মাধ্যমে সাগর থেকে মাছ আহরণ হয়েছে ৭ লাখ ১৯ হাজার ৬১৯ টন। এর মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে এসেছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭ টন। ছোট নৌযানের মাধ্যমে আহরিত হয়েছে ৫ লাখ ৭৩ হাজার ২৪৯ টন। যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৫৯৪ টন মাছ আহরিত হয়েছিল। বিগত বছরগুলোয় মাছ আহরণ ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সমাপ্ত অর্থবছরে কমেছে ১৪ হাজার ৯৭৫ টন।
বিগত বছরগুলোয় মাছ আহরণের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে মাছ আহরণ হয়েছে ৭ লাখ ৫ হাজার ৮৭১ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬ লাখ ৮৯ হাজার ১০৪ টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৯১১, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৬৮৭, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৩৭ হাজার ৪৭৬, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬ লাখ ২৬ হাজার ৫২৮, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪৬, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৩৮৫ টন মাছ আহরিত হয়েছে।
সমাপ্ত অর্থবছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সমুদ্র থেকে ইলিশ আহরণ হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার ৯২৮ টন, সার্ডিন ৫১ হাজার ৫০০, বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি ৪৬ হাজার ৭৬৩, টুনা ও টুনা-জাতীয় মাছ ১৫ হাজার ৫১, লইট্টা ৮১ হাজার ৯৪২, লাক্ষা ২০০, পোয়া ৪২ হাজার ৭৫৪, চাঁন্দা ১২ হাজার ৫২, ক্যাট ফিশ ১৫ হাজার ৩০৫, হাঙর ও শাপলা পাতা জাতীয় মাছ ৩ হাজার ৩৫১ টন। অন্যান্য মাছ আহরণ হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৭৩ টন। সমাপ্ত অর্থবছরে সমুদ্র থেকে ইলিশ আহরণ হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার ৯২৮ টন। কিন্তু গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ইলিশের আহরণ ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ৮৭১ টন। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ইলিশ আহরণও কমেছে ৯৪৩ টন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া নৌযানগুলো নজরদারির মধ্যে রাখা জরুরি। নৌযানে মাছ আহরণের জন্য ট্রাকিং সিস্টেম রাখা দরকার। এছাড়া ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করলে সরকারই লাভবান হবে।
চট্টগ্রাম মৎস্য অধিদপ্তরের (সামুদ্রিক) সহকারী পরিচালক মো. ফারুক হোসাইন সাগর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি বছর সমুদ্র থেকে মাছ আহরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন জেলেরা। পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে আহরণ কম-বেশি হতে পারে। বর্তমানে মাছ শিকারে সমুদ্রে ৬৫ দিন এবং অক্টোবরে সমুদ্র ও নদীতে ২২ দিনের দুটি নিষেধাজ্ঞা দেয়া হচ্ছে। এর সুফল পাওয়াও গেছে। ৬৫ দিনের জন্য সমুদ্রে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে বড় আকারের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে অহরহ। বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ মাছের চাহিদা বিবেচনা করে কীভাবে মাছ আহরণ বাড়ানো সম্ভব সেই বিষয়ে কাজ করছি আমরা।’
এদিকে সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় বর্তমানে সমুদ্রে মৎস্য আহরণে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক ট্রলার রয়েছে ২৬৩টি। যদিও গত বছর এ সময়ে নিবন্ধন ছিল ২৩১টি জাহাজের। নিবন্ধন থাকা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর বেশির ভাগই ফিশিংয়ে নিয়োজিত। বাণিজ্যিক নৌযানের মধ্যে রয়েছে চিংড়ি ট্রলার, ট্রায়াল ট্রিপ বটম, মিডওয়াটার রূপান্তরিত ট্রলার বটম ট্রলার ও মিডওয়াটার ট্রলার। সমুদ্রে যান্ত্রিক (ইঞ্জিনচালিত ও ইঞ্জিনবিহীন) নৌযানের অনুমোদন আছে প্রায় ৬৬ হাজার। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর মধ্যে কাঠের তৈরি নৌযানের মাছ আহরণ ক্ষমতা ৪৫-৫০ টন এবং স্টিল বডির জাহাজগুলোর ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চ ৪০০-৪৫০ টন।
২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর নতুনভাবে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় যুক্ত হয়েছে। এছাড়া সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ বৃদ্ধি এবং পূর্ণাঙ্গ মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বছরে ৬৫ দিন ও ২২ দিনের দুবার নিষেধাজ্ঞা জারি করছে সরকর। এ নিষেধাজ্ঞার কারণে মাছের আকৃতি ও ওজনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
সামুদ্রিক মৎস্য জরিপ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে ইলিশের চাহিদা বরাবরই বেশি থাকে। বর্তমানে সমুদ্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে চাহিদাসম্পন্ন মাছ আহরণে গুরুত্ব দিচ্ছি। যারা সমুদ্রে মাছ আহরণে যাচ্ছেন, তাদের আমরা পরামর্শ দিচ্ছি। যাতে বাণিজ্যিক দিক বিবেচনা করেই তারা মাছ আহরণ করেন। কারণ সব মাছের চাহিদা থাকে না। অবাণিজ্যিক মাছ সমুদ্রের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখার জন্য বড় ভূমিকা পালন করে।’










