কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে জামালপুরে যমুনা ও দশানী নদীর পানি বাড়ছে। পাশাপাশি কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। কয়েক দিনের ভাঙনে নদীতে বিলীন হয়েছে বেশকিছু ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি। ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে সড়কের পাশে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, জিও ব্যাগ ডাম্পিং করেও ভাঙন রোধ করা যাচ্ছে না। তবে গত কয়েক দিনের মধ্যে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

নদী তীরের বাসিন্দারা বলছেন, ভাঙন রোধে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ অবস্থায় তারা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। ভাঙনে মেরুরচর ইউনিয়নের ঘুঘরাকান্দি, আইরমারী মন্দী পাড়া, উজান কলকিহারা, কলকিহারা ও খাপড়া পাড়া গ্রামের প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবারের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। সাধুরপাড়া ইউনিয়নের চর আইরমারী, বাংগাল পাড়া ও বালুগ্রামের ফসলি জমিও নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। ঘুঘরাকান্দি বাজার, একটি মসজিদ ও একটি গ্রামীণ সড়ক ভাঙনের কবলে পড়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে মন্দীপাড়ার সেতু, বাজার ও ফসলি বিঘা জমি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিন ধরে জামালপুরে টানা বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল। দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর ও মাদারগঞ্জ উপজেলায় যমুনা নদীর বাম তীরে এবং বকশীগঞ্জ উপজেলার দশানী নদীতে ভাঙন শুরু হয়েছে। দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানী ইউনিয়নের চর ডাকাতিয়াপাড়া এলাকায় তীব্র ভাঙানের কারণে কয়েকশ একর জমি ও অর্ধশতাধিক বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের কারণে ওই এলাকার একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও নিলামে বিক্রি করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইসলামপুরের কৃষক মো. মনির হোসেন জানান, নদীতে তার ফসলি জমি ভেঙে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে ঘরবাড়ি। এখন তেমন কোনো কাজ নেই। বেকার বসে আছেন। পরিবার নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন। অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি সহায়তার।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আসাদুজ্জামান জানান, দ্রুত জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা না হলে ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। যাদের টাকা পয়সা আছে তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘরবাড়ি নিয়ে গেছে, আবার অনেকে রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছে।

অন্যদিকে ইসলামপুর উপজেলার সাপধরী ইউনিয়নের কাশারীডোবা পয়েন্টে যমুনার একটি শাখা নদীতে শুরু হয়েছে ভাঙন। এরই মধ্যে কয়েক বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এসব জমিতে ফসলও ছিল।

উপজেলার চিনাটুলী গ্রামের আমান উল্লাহ জানান, যমুনার ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে ফসলি জমি, সড়ক, মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। হঠাৎ নদী ভাঙনের ফলে ভুট্টা, মরিচ ও আখসহ অন্যান্য ফসলি জমি প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে।

পাকরুল এলাকার মামুনুর রশিদ জানান, হঠাৎ করেই নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। ঋণ নিয়ে জমি চাষ করেছিলেন তিনি। এখন জমির সঙ্গে ফসলও গেছে। বাড়িঘর নিয়েও চিন্তায় রয়েছেন। এ অবস্থায় ঋণ পরিশোধ করবেন কি করে ভেবে পাচ্ছেন না।

অন্যদিকে বকশীগঞ্জের দশানী নদীর পানি বাড়ার কারণে গত এক সপ্তাহে দুইপাড়ের প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের কবলে পড়েছে। আতঙ্কে রয়েছেন উপজেলার মেরুরচর ও সাধুরপাড়া ইউনিয়নের আট গ্রামের মানুষ। নদীতে বিলীন হয়েছে প্রায় ৭০টি পরিবারের ঘরবাড়ি। মেরুরচর ইউনিয়নের ঘুঘরাকান্দি, আইরমারী মন্দীপাড়া, উজান কলকিহারা, কলকিহারা ও খাপড়াপাড়া গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবারের বসতভিটা ভাঙনের কবলের পড়েছে। একই সঙ্গে সাধুরপাড়া ইউনিয়নের চর আইরমারী, বাংগাল পাড়া ও বালুগ্রামের ফসলি জমিও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

এ বিষয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা জানান, নদী ভাঙনকবলিত এলাকার খোঁজ নেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে। ভাঙন রোধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সার্বিক বিষয়ে জামালপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবুজ্জামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদীর তীরবর্তী ২১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকাজ চলমান। এছাড়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে স্থায়ী প্রকল্প নেয়া হবে।’