করোনা মহামারীর প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়া মৌলভীবাজারের আগর-আতর শিল্প এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমায় উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে কম। তাই সীমিত করা হয়েছে কারখানাগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম। আবার বন্ধ রয়েছে ছোট-বড় অনেক কারখানা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। উৎপাদন চালু রাখতে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের দাবি ব্যবসায়ীদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগর-আতরের আতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের বড়লেখায় আগর চাষের ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের। তবে ১৯৪০ সালের দিকে বড়লেখায় আগর চাষে বিস্তার ও ব্যবসা সুসংগঠিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। সেসব কারণে অনেকে মৌলভীবাজারকে আগর-আতরের জেলাও বলে। বড়লেখা ছাড়াও জেলার কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ীসহ বিভিন্ন উপজেলায় বর্তমানে আগর চাষ হচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৫ সালে শিল্প হিসেবে ঘোষণার পর বাণিজ্যিকভাবে আগর চাষ বেড়েছে এ অঞ্চলে। বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নে প্রায় ৩০০ ছোট-বড় আগর-আতর কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এছাড়া জেলার অন্যান্য স্থানেও আছে আরো প্রায় ৫০টি কারখানা। তবে বন বিভাগের হিসাবমতে, জেলায় নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা ১৭৬। আগর-আতরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত মৌলভীবাজারের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ।

বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নকে আগর-আতরের রাজধানী বলা হয়। এ ইউনিয়নের সালদিঘা, রফিনগর, হাসিমপুর, চিন্তাপুর, বড়থল গ্রামসহ আশপাশের গ্রাম ও পাথারিয়ার পাহাড়ি এলাকায় সবচেয়ে বেশি আগর চাষ হয়। কিন্তু কভিড-১৯-এর কারণে ধস নামে এ শিল্পে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমেছে সুগন্ধি পণ্যটির। রফতানি কম হওয়ায় হাজার হাজার কেজি আগরের কাঁচামাল মজুদ পড়ে আছে গুদামে।

ব্যবসায়ীরা জানান, শুধু বড়লেখায় বছরে প্রায় এক হাজার লিটার আগরের নির্যাস উৎপাদন হয়। প্রতি লিটার আতরের বাজারমূল্য বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৮ লাখ। আতরের পাশাপাশি আগর কাঠও রফতানি হয়। সারা দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ আগর-আতর উৎপাদন হয়, চাহিদার বিপরীতে তা একেবারেই অপ্রতুল। বিশ্ববাজারে দিন দিন চাহিদা বাড়ছিল পণ্যটির। প্রতি বছর আগর-আতর রফতানি করে শতকোটি টাকা দেশে আসে। কিন্তু দুই বছর ধরে কভিডের কারণে বড় লোকসানের মুখে পড়েছে এ শিল্প।

২০২০ সালে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে বন্ধ করে দেয়া হয় বিমানের ফ্লাইট। এতে বন্ধ হয়ে যায় সুগন্ধি রফতানি কার্যক্রম। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর চাহিদা কমায় রফতানিও কমেছে। এ অবস্থায় অধিকাংশ কারখানা বন্ধ রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীর ঘরে কোটি কোটি টাকার পণ্য পড়ে আছে। বিক্রি করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন তারা। অন্যদিকে কাজ না থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন শ্রমিকরা।

ব্যবসায়ীরা আরো জানান, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, ওমান, ইয়েমেনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে মৌলভীবাজারের আগর-আতর রফতানি হয়। কুয়েত, সৌদি আরব, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বাংলাদেশীদের কয়েকটি আগর-আতর কারখানা রয়েছে। যেখানে চাহিদার বিপরীতে জোগান দেয়া যাচ্ছিল না, সেখানে এখন কোনো পণ্যই বিক্রি হচ্ছে না।

সরেজমিনে সুজানগর ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ছোট কারখানা বন্ধ রয়েছে। মাঝারি কয়েকটি কারখানা খোলা থাকলেও কমানো হয়েছে শ্রমিক সংখ্যা। কারখানার শ্রমিক রুবেল আহমদ ও রুবুল আমিন জানান, আগর-আতর কারখানায় স্থানীয় কয়েক হাজার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। কিন্তু করোনার শুরু থেকেই পণ্য রফতানি হচ্ছে কম। অধিকাংশ কারখানা বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। মজুদ পণ্য যাতে নষ্ট না হয় এজন্য কিছু কারখানা খোলা রাখা হয়েছে।

ব্যবসায়ী আব্দুল বাতিন জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তার ছোট কারখানায় কাজ করেন ২০ জন শ্রমিক। পণ্য রফতানি করতে না পারায় বর্তমানে তিনি কারখানার কার্যক্রম সীমিত করেছেন। প্রায় ১৫ লাখ টাকার পণ্য মুজদ রয়েছে তার কারখানায়। এ অবস্থা প্রায় অন্যদেরও। প্রায় সবার ঘরে সুগন্ধি পড়ে আছে।

রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান বে অব বেঙ্গল পারফিউমারির স্বত্বাধিকারী কবির আহমদ জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে ৫০ জন কাজ করেন। কারখানার ১৬টি মেশিনে মাসে গড়ে ২০০ তোলা (এক তোলায় ১১.৬২ গ্রাম) আতর উৎপাদন হয়। প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করে তাদের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, মৌলভীবাজারের উৎপাদিত শতকোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও গ্রামীণ জনপদের কর্মসংস্থানের বড় মাধ্যম এ শিল্প। এখানকার অধিকাংশ কারখানা ছোট। ফলে সবার পক্ষে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে রফতানি সম্ভব নয়। ৮-১০টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি পণ্য রফতানি করে। ছোট কারখানার পণ্য বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কিনত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ছোট-বড় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ মুহিত ছায়েফ বলেন, প্রতি মাসে জেলার কারখানাগুলোয় কম করে হলেও ২০০ কেজি আগর কাঠ ও ২৫০ লিটার আতর উৎপাদন হতো। অধিকাংশ কারখানা বন্ধ এবং পণ্য বিক্রি না হওয়ায় অন্তত শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে ব্যবসায়ীদের। ব্যাংক ঋণ নিয়ে যারা ব্যবসা করছেন তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, বড়লেখার সুজানগর এলাকার অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। কারখানা বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে অনেকে।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান বলেন, প্রায় সব শিল্পের মতো মৌলভীবাজারের আগর-আতর শিল্প করেনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ শিল্পকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে এরই মধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (সার্বিক) প্রধান করে গঠিত এ কমিটি ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা প্রদানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে।