দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ টন। এ বছর এখন পর্যন্ত ৯৮ শতাংশ জমির পেঁয়াজ তোলা হয়েছে। ফলন হয়েছে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার টন। এপ্রিলের শুরুতে বৃষ্টি হওয়া ও বীজের মধ্যে কয়েকটি জাতের মিশ্রণ থাকায় ফলন কমের পাশাপাশি এরই মধ্যে অনেক কৃষকের পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন মূলত সংরক্ষণ দুর্বলতা ও ভালো জাতের অভাব পেঁয়াজ উৎপাদনের সাফল্যকে মলিন করে দিচ্ছে। তাই চাহিদার চেয়ে উৎপাদন অনেক বেশি হলেও প্রতি বছরই পেঁয়াজ আমদানি করতে হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ৯৮ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজের ফলন হয়েছে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার টন। গত অর্থবছর অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ৩৬ লাখ ৪১ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ আবাদ হয় ২ লাখ ১২ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার হেক্টর। এ সময়ের মধ্যে কৃষিপণ্যটির উৎপাদনশীলতা হেক্টরপ্রতি ১১ টন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ টনে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর কয়েকটি জেলায় ভেজাল বীজের কারণে পেঁয়াজের চারা কম গজানো ও গজানোর পর মরে যাওয়ায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকরা। ফলে পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। সাধারণত কৃষকরা মার্চ ও এপ্রিলে পেঁয়াজ তুলে ঘরে নেন। এরপর রোদে শুকিয়ে দেশীয় পদ্ধতিতে মাচা তৈরি করে সংরক্ষণ করেন, যা জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত বাজারে বিক্রি হয়। এতে পেঁয়াজের ওজন ৩০-৩৫ শতাংশ কমে। তবে এ বছর এপ্রিলের শুরুতে বৃষ্টি হওয়া ও বীজের মধ্যে কয়েকটি জাতের মিশ্রণ থাকায় যেমন ফলন কম হয়েছে, তেমনি স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। এখনই কৃষকদের পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, এ পেঁয়াজ রেখে দিলে জুন পর্যন্ত ৭০ শতাংশই পচে যাবে। তাই কৃষক এখনই তাদের পেঁয়াজ বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে জুলাই-আগস্টে আবারো দেশের বাজারে পেঁয়াজের সংকট দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পেঁয়াজ উৎপাদনে শীর্ষ জেলাগুলোর অন্যতম রাজবাড়ী। এ বছর রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলায় ৮০০ কৃষকের ৭০৫ হেক্টর জমির পেঁয়াজ ভেজাল বীজের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বালিয়াকান্দি উপজেলার পূর্ব মৌকুড়ী গ্রামের পেঁয়াজচাষী আকুল শেখ বলেন, ‘৭৫ শতাংশ জমিতে লাল তীর কিং পেঁয়াজ বীজ রোপণ করেছিলাম। আশা ছিল পেঁয়াজে নয় সদস্যের সংসারের খরচ মিটবে। কিন্তু ভেজাল বীজে সে আশা ভেস্তে গেছে। একটি চক্র লাল তীর পেঁয়াজ বীজ দেয়ার কথা বলে দিয়েছে ভারত ও বার্মার বীজ। ওই বীজ এ এলাকায় চাষ উপযোগী না। ফলে বীজ গজিয়েছে কম। যাও গজিয়েছে তার পাতা লালচে হয়ে মরে গেছে। খেত ভেঙে আবার নতুন করে পেঁয়াজ রোপণ করা হয়েছিল। এর পরও কষ্টের সেই পেঁয়াজ ঘরে রাখা যাচ্ছে না। পচন ধরায় বিক্রি করে ফেলতে হচ্ছে।’

রাজবাড়ী জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। জেলায় হালি পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য ২০০ টন বীজ প্রয়োজন হলেও উৎপাদন হয় ৮০ টন। বাকি ১২০ টন ঘাটতি থাকে, যা পাশের জেলাগুলো থেকে পূরণ করা হয়। এ সুযোগে পাশের জেলার অসাধু বীজ ব্যবসায়ীরা ভেজাল দেয়ার সুযোগ পায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজবাড়ীর উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এ বছর হালি পেঁয়াজ রোপণে ভেজাল বীজে ক্ষতি, বৃষ্টিতে পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা জানার জন্য সব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনা হবে। আর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সবসময় পেঁয়াজচাষীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন।’

এদিকে মেহেরপুরের কয়েকটি উপজেলায় কৃষকরা ভারতীয় সুখ সাগর জাতের অতিরিক্ত উচ্চফলনশীল (উফশী) বীজ ক্রয় করলেও প্রতারিত হয়েছেন অনেকে। তাদের অভিযোগ, পেঁয়াজের উঠতি বয়সে দেখা যায় দু-তিন জাতের পেঁয়াজ। একই খেতে দু-তিন জাতের পেঁয়াজ এবং ফলন কম এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে ধরনা ধরেও কোনো লাভ হয়নি। এদিকে প্রতি বছরের মতো নিজস্ব পদ্ধতিতে সংরক্ষণে রাখা পেঁয়াজ হঠাৎই ঈদের আগে থেকে পচে যাচ্ছে। ফলে অনেকেই ফেলে দিয়েছে পচে যাওয়া পেঁয়াজ। আবার অনেক চাষী কম মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছেন স্থানীয় বাজারে। যার ফলে আগামী দিনে পেঁয়াজের দাম বাড়বে বলে আশঙ্কা করছে অনেকে। এছাড়া স্থানীয়ভাবে পেঁয়াজ সংরক্ষণে রাখা চাষীরাও লোকসানের মুখে পড়েছেন।

মুজিবনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামের পেঁয়াজচাষী শান্তিরাজ জানান, উপজেলার সোনাপুর গ্রামের এক বীজ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পাঁচ বিঘা জমিতে চাষের জন্য ভারতীয় উচ্চফলনশীল পেঁয়াজ বীজ ৭ হাজার টাকা কেজি দরে কিনি। মোট ১২ কেজি বীজ কিনে সেচ সারসহ চাষ শেষে পেঁয়াজের উঠতি সময়ে দেখা যায় তিন রকম জাত। আবার ফলন কম হয়েছে। ভেজাল বীজের কারণে লোকসানে পড়েছি। ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাইনি।’

উপজেলার বিশ্বনাথপুর গ্রামের নিজাম ও কালাম জানান, আগের মতোই এবারো তারা নিজস্ব পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণে রাখেন। কিন্তু হঠাৎ করেই ঈদের কয়েকদিন আগে এসব পেঁয়াজ পচা শুরু হয়। অল্প কিছু পেঁয়াজ বেচতে পারলেও বেশির ভাগই ফেলে দিয়েছেন।

একই এলাকার সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ১১ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেন। তার মধ্যে আট বিঘা জমির পেঁয়াজ নিম্নমানের ভেজাল বীজের কারণে ফলন কমেছে। এতে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন। শুধু তার অবস্থাই এ রকম নয়, এলাকার অনেক চাষীর পেঁয়াজ পচে গেছে। তারাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকেই স্থানীয় বাজারে অল্প দামে বিক্রি করে দিয়েছেন, আবার পচে যাওয়া পেঁয়াজ বিক্রি না হওয়ায় ফেলেও দিয়েছেন। কী কারণে এমনটি হয়েছে বোঝা যাচ্ছে না।

জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মেহেরপুর জেলায় ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মুজিবনগর উপজেলায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের চাষ হয়েছে।

মাগুরা সদর উপজেলার লক্ষ্মীকোল গ্রামের পেঁয়াজচাষী আমিরুল ইসলাম জানান, এ বছর দেশী ও ভারতীয় জাতের প্রায় ২০০ মণ পেঁয়াজ ঘরে তুলেছেন। এর মধ্যে লালপির ও নাসিক জাতের পেঁয়াজে বেশি পচন ধরেছে। তবে দেশী জাতের তাহেরপুরি পেঁয়াজ খুব একটা নষ্ট হয়নি। পাশের গ্রাম ফুলবাড়ীর ফারুক হোসেন জানান, এ বছর পেঁয়াজ চাষ করে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এ বছর মাত্র ৫০ মণ পেঁয়াজ ঘরে তুলতে পেরেছি। অতিরিক্ত গরমে দেশী পেঁয়াজের তুলনায় ভারতীয় জাতের পেঁয়াজ নষ্ট হচ্ছে বেশি।’ ভালো দাম নিশ্চিত ও উন্নতমানের সংরক্ষণাগার নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

মাগুরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুফি মো. রফিকুজ্জামান জানান, চলতি বছর জেলায় ১১ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, আবাদ হয়েছে ৯ হাজার হেক্টর জমিতে। কিন্তু সংরক্ষণাগার না থাকায় কিছু পেঁয়াজ নষ্ট হচ্ছে।

ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় পেঁয়াজ উৎপাদন হয় শতভাগ। সালথার কৃষক নাসির হোসেন বলেন, ‘পেঁয়াজ ওঠানোর আগে আগে বৃষ্টির কারণে কিছু পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যেগুলো পচে যাচ্ছে, সেগুলো বিক্রি করে দিচ্ছি। তবে অর্ধেকের বেশি পেঁয়াজ ভালো আছে যেগুলো আগে তুলতে পেরেছিলাম।’

যদিও উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে গত কয়েক বছরে পেঁয়াজ আমদানি কিছুটা কমেছে। তবে সংরক্ষণ দুর্বলতায় উদ্বৃত্তের সুফল ভোগ করতে পারছে না বাংলাদেশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮ লাখ ৬৩ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে করা হয় ১০ লাখ ৭ হাজার টন। ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৩ হাজার টন ও ৬ লাখ ৬৫ হাজার টনে। আমদানীকৃত পেঁয়াজের প্রায় পুরোটাই ভারতীয়।

ভারতের বাণিজ্য বিভাগের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ভারত থেকে ৬ লাখ ৫৮ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। আর ২০২২ সালে এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে আমদানি করা হয়েছে ৫ লাখ ১০ হাজার টন। এছাড়া গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর—এ ছয় মাসে ৭ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলারের পেঁয়াজ আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে জুলাইয়ে ১ কোটি ২৯ লাখ ডলার, আগস্টে ১ কোটি ৬১ লাখ, সেপ্টেম্বরে ১ কোটি ৫৮ লাখ, অক্টোবরে ১ কোটি ৩২ লাখ, নভেম্বরে ১ কোটি ২৬ লাখ ও ডিসেম্বরে ৮১ লাখ ডলারের পেঁয়াজ আমদানি করা হয়।

পেঁয়াজ-রসুন সংরক্ষণের বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের একটি প্রকল্প চলমান। এ প্রকল্পের মাধ্যমে সাত জেলায় মোট ৩০০টি ঘর নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটির উপপরিচালক মো. জাহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছর আমাদের ৮০টি ঘরের টেন্ডার আহ্বান করেছিলাম। ঈদের আগে আরো ৫৬টি ঘরের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। কিছু জায়গায় ঘর প্রস্তুত হয়েছে, এখন উদ্বোধনের অপেক্ষা। এসব ঘরে অন্তত পাঁচ-ছয় মাস পেঁয়াজ-রসুন সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একটি ঘর পাঁচটি পরিবার ব্যবহার করতে পারবে। সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে কৃষকের পেঁয়াজ নষ্ট হয়। এগুলো নিয়েও আমরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।’

কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার যদি আগেই পেঁয়াজ পচে যায় তাহলে কৃষক সংরক্ষণ না করে এখনই বাজারে ছেড়ে দেবেন। যার কারণে সামনে আবার আমদানির ওপরই তাকিয়ে থাকতে হবে। চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন করেও সে সুফল আমরা ভোগ করতে পারব না। এর পেছনে বড় কারণ সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের অভাব।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ রেজা অনিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছর ভেজাল বীজের কারণে একটা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। কৃষক পেঁয়াজ তুলে দেখেছেন ১২-১৫টায় এক কেজি হয়ে যাচ্ছে। সাধারণত ফরিদপুর বা আশপাশের জেলাগুলোতে এ জাতের পেঁয়াজ তো কৃষকরা চাষ করেন না। বীজের মধ্যে হয়তো মিশ্রণ রয়েছে। তবে সার্বিকভাবে পেঁয়াজ উৎপাদনের সুফল পেতে হলে আমাদের তথ্যের ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী হতে হবে। তথ্য সংগ্রহকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে তথ্যের অনেক তফাত থাকে। এ কারণে সঠিকভাবে পলিসি নেয়া যায় না। সঠিক তথ্য পেলে বছরে কতটুকু আমদানি করতে হবে বা কখন করতে হবে সেটার সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। আর ভেজাল বীজ ঠেকাতে মনিটরিং বাড়াতে হবে। যারা ভেজাল বীজ কৃষকদের হাতে তুলে দিচ্ছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’

 (প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন রাজবাড়ী, মেহেরপুর, মাগুরা, নড়াইল ও ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি)