উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তলদেশে পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরের খাল-বিল। এরই মধ্যে ভরাট হয়ে অস্তিত্ব হারিয়েছে অনেক খাল-বিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে হুমকিতে পড়বে হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য। সংকটে পড়বে হাওরের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবিকা।
সরকারি তথ্যমতে, প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর আয়তনের হাকালুকি। বর্ষাকালে হাওর-সংলগ্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে আয়তন দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৭০০ হেক্টরে। এই সময় পানির গভীরতা হয় ২-৬ মিটার। হাকালুকি হাওরের ৮০ ভাগ মৌলভীবাজারে ও ২০ ভাগ সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। মৌলভীবাজারের বড়লেখা অংশে ৬০ ভাগ, কুলাউড়ায় ১২ ও জুড়ী উপজেলায় ৮ ভাগ রয়েছে। হাওরে ছোট-বড় ২৩৮টি বিল রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার অংশে ২০০টি আর বাকি ৩৮টি সিলেট অংশে।
জেলা মত্স্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৩৮টি বিলের মধ্যে সম্পূর্ণ ভরাট হয়েছে কমপক্ষে ২১টি বিল। বাকিগুলোর আংশিক ভরাট হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ ভরাট হওয়া বিলের মধ্যে কুলাউড়া উপজেলার মেদি বিল, ধলিয়া হাওর বিল, চিকনমাটি বিল, আদা চাপড়া বিল, বিলাইয়া বিল, বইশমারা বিল; জুড়ী উপজেলার তুরল বিল, হুগলা বিল, লামা তুরল, উপর তুরল, লাড়ির ডাক, বালিয়াজুড়ি; বড়লেখা উপজেলার মালাম বিল, ফুয়ালা বিল, জল্লা বিল, বালিয়া বিল, মাইজলা বিল অন্যতম। এছাড়া আরো অনেক বিল আংশিক বা অর্ধেকের বেশি ভরাট হয়ে কোনোভাবে টিকে রয়েছে।
কুলাউড়ার ভুকশিমুইল এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বইশমারা ও বিলাইয়া বিল পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব বিলে গরু-মহিষ চরানো হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, বর্ষাকালে এসব বিল এলাকায় পানি থাকলেও শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে যায়। কয়েক বছর আগেও পানি ছিল, মাছ ধরা পড়ত। কিন্তু ক্রমেই ভরাট হয়ে এখন শুকনো মাঠের আকার ধারণ করেছে। বিলের নিচু অংশে কিছুু স্থানে ধান চাষ হচ্ছে, আর কিছু অংশে স্থানীয়রা গরু-মহিষ চরায়। বিল ভরাটের কারণে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। আগে শাপলা সিঙ্গাইরসহ অনেক জলজ উদ্ভিদ দেখা যেত, এখন সেগুলো নেই।
স্থানীয় মীর শংকর গ্রামের মত্স্যজীবী মুহিবুর রহমান বলেন, বিল ভরাট হওয়ায় মাছ কমে গেছে। সারা দিন মাছ ধরে যে অর্থ মেলে তাতে সংসার চলে না। সেজন্য পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন জেলেরা।
ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, বিলগুলো ভরাট হয়ে ধান চাষ হচ্ছে। ক্রমেই এসব বিলের জমি দখল হয়ে যাচ্ছে। অবিলম্বে বিলগুলো খনন করা দরকার। না হলে একদিন হাকালুকি অস্তিত্ব হারাবে।
একই অবস্থা হাওরাঞ্চলের নদী, ছড়া ও খালের। সরকারি ও স্থানীয় তথ্যমতে হাকালুকির সঙ্গে যুক্ত ছিল ১০টি ছোট-বড় নদী। নদীগুলো হলো জুড়ী, কণ্ঠীনালা, মরা জুড়ী, ফানাই, নিকড়ি, ষাটমা, বরুদল, বিলাম ও সুনাই অন্যতম। এর মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় জুড়ী ও কণ্ঠীনালা নদী। কুলাউড়ায় ফানাই নদ আর বড়লেখার সুনাই নদ। বাকিগুলো পরিণত হয়েছে ছোট খালে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় থেকে নদীগুলোর উত্পত্তি। তাই প্রতি বছর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে প্রচুর পলি ও বালি আসে হাওরে, যা বিলগুলো ভরাট করে দেয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সেন্টার ফর ন্যাচারাল স্টাডিজ (সিএনআরএস) ২০০৩-১৮ সাল পর্যন্ত হাকালুকিতে যৌথভাবে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। সেই প্রকল্পের তথ্যমতে, একসময় এ হাওর ঘিরে ছিল ছোট-বড় তিন শতাধিক ছড়া ও খাল। বর্তমানে প্রবাহ চলমান ছড়া আছে প্রায় ৮১টি। বাকিগুলো বিলীন হয়েছে। বিলীন হওয়া ছড়া খালের মধ্যে সারর খাল, চান্দর খাল, গোগালী ছড়া, কচমার খাল, লামাই লঙ্গির খাল, জামলার খাল, কাটুয়া খাল, পনার খাল উল্লেখযোগ্য।
কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমুইল ইউনিয়নের ভুকশিমুইল গ্রামের আব্দুল খালিক বলেন, মরা খালগুলোতে আগে নৌকা চলত, মাছ ধরা পড়ত। এখন সেখানে ধান চাষ হয়। ভরাট হচ্ছে আর জনবসতি বাড়ছে। এভাবে হাওর এলাকা ছোট হয়ে আসছে।
একই উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নের আলীনগর এলাকার মাছ ব্যবসায়ী সাইফুর রহমান জানান, হাওর খাল ভরাট হওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন মত্স্যজীবীরা। বর্ষায় ভাসান পানিতে আগের মতো আর মাছ হয় না। তাছাড়া ইজারাদাররা বিল শুকিয়ে মাছ ধরায় পরবর্তী সময়ে বংশ বৃদ্ধির মতো মাছ থাকে না। এজন্য মাছ কমে যাচ্ছে। এতে বিপদে পড়ছেন হাওর পাড়ের জেলেরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার মৌলভীবাজারের সভাপতি আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, বাংলাদেশের জলজ উদ্ভিদ প্রজাতির অর্ধেকেরও বেশি হাকালুকি হাওরে জন্মে। হাওর তীরের প্রায় দুই লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ হাওরের ওপর নির্ভরশীল। বিল, খাল ও নদী ভরাটের ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এদের রক্ষায় এখনই ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের সহকারী পরিচালক নুরুল হুদা বলেন, হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি মানুষের অধিক চাপ, প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহারসহ অনেক কারণ রয়েছে। মত্স্য বিভাগ, বন বিভাগের বন্যপ্রাণী বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সবাই মিলে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। সেটা করতে আমরা চেষ্টা করছি।
জেলা মত্স্য বিভাগের তথ্যমতে, হাওরে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এ বছর হাকালুকিতে (মৌলভীবাজার অংশে) জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার টন মাছ উৎপাদন হয়, যা গত বছর ছিল সাড়ে ৬ হাজার টন। জেলায় বছরে মাছের চাহিদা ৪৭ হাজার ৪২৭ টন। এই হাওরে ১০টির মতো মাছের অস্থায়ী অভয়াশ্রম থাকলেও স্থায়ী কোনো অভয়াশ্রম নেই। এ কারণেও উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, খাল-বিল ভরাট হওয়ায় প্রভাব পড়ছে মত্স্য উৎপাদনে। মাছের স্থায়ী অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, খাল, বিল ও নদী ভরাটের কারণে ভারসাম্য হারাচ্ছে হাওরের পরিবেশ। মাছ ও জলজ উদ্ভিদ কমায় খাদ্য সংকটে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে পরিযায়ী পাখি। বিলগুলো খনন করা জরুরি।










