চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক। সড়কটি দিয়ে হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও রাঙ্গামাটি সদর, কাপ্তাই, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে চলাচল করে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। ১৮-২২ ফুটের সড়কটি বিভিন্ন সময় সংস্কার হলেও প্রশস্ত করা হয়নি। এবার সরু সড়কটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগ। তবে প্রকল্পের প্রথম মেয়াদ শেষ হলেও সরানো হয়নি সড়কের পাশে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি। কিন্তু সম্প্রসারণের প্রয়োজনে এরই মধ্যে কয়েকশ গাছ কেটে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, নগরীর কালুরঘাটসংলগ্ন মোহরা রাস্তার মাথা থেকে কাপ্তাই পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য ৫২ কিলোমিটার। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সড়কটি সম্প্রসারণকাজ শুরু করে সওজ চট্টগ্রাম কার্যালয়। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেয়া প্রকল্পটির অধীনে প্রাথমিকভাবে মোহরা রাস্তার মাথা থেকে রাউজানের গশ্চি পর্যন্ত সড়কের দুই পাশ সম্প্রসারণ করা হবে। দুটি প্যাকেজে সাড়ে ১৩ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত করতে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। তবে বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণ না করায় প্রকল্পের কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। বিশেষ করে অধিকৃত ভূমি থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ প্রকল্পের কাজকে বিলম্বিত করছে। এ কারণে ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও এখনো অর্ধেক কাজই শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, মোহরা রাস্তার মাথা থেকে মদুনাঘাট সেতুর হাটহাজারী পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার সড়কটি ৩৪ ফুটে উন্নীত করা হবে। এজন্য বিদ্যমান ২০-২৫ ফুট সড়কটির উভয় পাশে স্থানভেদে ৫ ফুট করে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে মদুনাঘাট সেতুর রাউজান থেকে নোয়াপাড়ার গশ্চি ধরের টেক পর্যন্ত বাকি আট কিলোমিটার সড়কটি ৩০ ফুটে উন্নীত করা হবে। বর্তমানে সড়কটি সর্বোচ্চ ২০ ফুট প্রশস্ত রয়েছে। এ কাজে ব্যয় হবে ২৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। সড়কটির বিভিন্ন অংশে তীব্র যানজট হয়। এজন্য মোহরা রাস্তার মাথা এলাকার জিরো পয়েন্ট থেকে ৮০ মিটার সড়ক চার লেন করা হবে। আবার নজুমিয়া হাট এলাকার সড়কটির ২০০ মিটার অংশে বিভাজক যুক্ত করে উভয় পাশে ১৮ ফুট করে সর্বমোট ৩৬ ফুটের করা হবে। একইভাবে নোয়াপাড়া বাজার এলাকার ২০০ মিটার সড়কও ৩৬ ফুটে উন্নীত করা হবে।
সওজ কর্তৃপক্ষ বলছে, ১৩ কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণ এলাকায় সওজের জমিতে ১১৪টি বৈদ্যুতিক খুঁটি রয়েছে। প্রকল্প শুরুর আগে বিদ্যুৎ বিভাগকে এসব খুঁটি প্রশস্তকরণ এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে চিঠি দেয়া হলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষ হলেও বৈদ্যুতিক খুঁটির কারণে অসম্পূর্ণ কাজ করে দায় সারছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সওজের বিপুল পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণ করা থাকলেও সম্প্রসারণ কাজের ফলে ফুটপাত রাখছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে সড়কটি সম্প্রসারণের পর দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে সওজ চট্টগ্রামের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. নিজাম উদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের সম্প্রসারণ কাজ শুরু হলেও আগাম বৃষ্টির কারণে শেষ করা যায়নি। বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে খুঁটি সরিয়ে নেয়ার আবেদন করা হলেও সেটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়াতে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। মেয়াদ বাড়ানো হলে ডিসেম্বরের মধ্যেই বৈদ্যুতিক খুঁটি সরিয়ে কাজ বুঝিয়ে দেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সড়কটির চট্টগ্রাম-কাপ্তাই দিকের ডান অংশে ১০৫ ফুট ও বাম অংশে ৭৫ ফুট ভূমি অধিগ্রহণ করা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সওজ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সড়ক সম্প্রসারণের কাজ শুরু হলেও সওজের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি। উচ্ছেদ সম্পন্ন না হওয়ায় সড়কটির বিভিন্ন অংশে কাজই শুরু করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া ১৩ কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন অংশে থাকা গাছগুলো এরই মধ্যে কেটে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে।
সড়কটির সম্প্রসারণ কাজের ধীরগতির বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইয়াকুব ব্রাদার্স ও মেসার্স আবদুস সালাম কন্সট্রাকশনের পরিচালক মো. শাহজাহান সিরাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা যথাসময়ে মোহরা-কাপ্তাই সড়কের মেরামত কাজ শুরু করেছি। কিন্তু এখনো বিভিন্ন স্থানে অধিগ্রহণ করা ভূমি বুঝিয়ে দিতে পারেনি সওজ। আবার বৈদ্যুতিক খুঁটি সরিয়ে নেয়ার কথা থাকলেও বিদ্যুৎ বিভাগের কাজের অগ্রগতি প্রায় শূন্য, যার কারণে অসম্পূর্ণ রেখেই সম্প্রসারণের অনেক কাজ করতে হচ্ছে। এতে সময়ক্ষেপণ ছাড়াও সড়ক সম্প্রসারণে কার্যাদেশের বাইরে অতিরিক্ত কাজ করতে হবে। সওজের পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধকতাগুলো সমাধান করা হলে দ্রুত কাজ শেষ করা সম্ভব।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়কটির উভয় পাশে জমি অধিগ্রহণ করা থাকলেও প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছেন। সড়ক সম্প্রসারণের জন্য মোহরা রাস্তার মাথা থেকে রাউজান পর্যন্ত ১০-১২টি স্থানে পুরনো গাছ কেটে নিয়েছে সওজ। প্রকল্পের কাজ শুরুর পর পরই গাছ কেটে ফেলা হলেও সম্প্রসারণ কাজের অন্যতম প্রতিবন্ধক বৈদ্যুতিক খুঁটি সরিয়ে নিতে এখনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে পারেনি সওজ। মূলত গাছ কেটে বিক্রি করা হলেও বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে খুঁটি সরিয়ে নিতে দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পটির মেয়াদ ছয় মাস বাড়াতে চেয়েছে সওজ কর্তৃপক্ষ। সড়কটির বিভিন্ন অংশে বৈদ্যুতিক খুঁটি রেখেই সড়ক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
রাউজান এলাকার বাসিন্দা হেলাল উদ্দীন শিকদার বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঘোষণা অনুযায়ী সড়ক সম্প্রসারণ করছে না। সম্প্রসারণ করা অংশের পাশে মাটির পথ তৈরি না করায় যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে মূল সড়কে। আবার সড়কের বিভিন্ন বিপজ্জনক বাঁকগুলো সরলীকরণ না করে সম্প্রসারণ কাজের ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যাবে।’










