সিলেটে কোরবানির ঈদের ছুটি শুরুর পর থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। ঈদের পঞ্চম দিন গতকাল পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল। ফলে ঈদের দীর্ঘ ছুটি পেলেও সিলেট অঞ্চলের পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় আশানুরূপ পর্যটকের সমাগম ঘটেনি। এতে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন হয়নি পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্যে। হতাশ হোটেল-মোটেল মালিকরা।
দেখা গেছে, ঈদের আগের দিন থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও ঈদের পরদিন সকাল থেকে টানা বৃষ্টি শুরু হয়। গতকাল পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সিলেট কার্যালয় সূত্র জানায়, সিলেটে রোববার সকাল ৬টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সর্বমোট ৩০৭ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। গতকাল সকাল ৬-৯টা পর্যন্ত ৬১ মিলিমিটার ও সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৫ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজীব হোসাইন বলেন, ‘আজও সিলেটে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।’
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা জানান, টানা বৃষ্টিতে সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় পর্যটকের উপস্থিতি খুব একটা লক্ষ করা যায়নি। এতে কাঙ্ক্ষিত ব্যবসা হয়নি পর্যটনসংশ্লিষ্টদের।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় বেশির ভাগ পর্যটক এখন কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথরমুখী। ঈদের দিন থেকে পরের কয়েক দিন ওই পর্যটন কেন্দ্রে ভিড় লেগে থাকত পর্যটকের। ঘাটে নৌকা ভাড়া নিয়ে ভিড় লেগে যেত। তবে এবার সে দৃশ্য ছিল না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা উন্মুখ হয়ে বসেছিলেন এবার ঈদে ভালো ব্যবসা হবে। তবে বৈরী আবহাওয়ার জন্য তা হয়নি। যেখানে হাজার হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটত সেখানে মাত্র ৪০০-৫০০ পর্যটকের আগমন ঘটেছে।’
কোম্পানীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা কবির আহমদ বলেন, ‘গতকাল হাতেগোনা কয়েকজন এসেছিলেন। দুপুরে বৃষ্টি উপেক্ষা করে ছাতা নিয়ে অনেকেই হাজির হয়েছিলেন। তবে বিকাল গড়াতেই এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে।’
সিলেটের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র জাফলং। সেখানেও পর্যটকের উপস্থিতি খুব একটা নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। এজন্য পর্যটকের তেমন একটা উপস্থিতি নেই।’
ব্যবসায়ী নজিবুর রহমান বলেন, ‘পর্যটক নেই, ব্যবসাও ভালো নেই। তবে রোদ উঠলে পর্যটক বাড়বে বলে আশা করছি।’
দেশের অন্যতম জলাবন রাতারগুলেও বৃষ্টির প্রভাবে পর্যটকের উপস্থিতি কম ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অথচ বর্ষাই হচ্ছে রাতারগুলের মূল আকর্ষণ। রাতারগুলের সৌন্দর্য উপভোগ করার এখনই ভরা মৌসুম। কিন্তু ভরা মৌসুমেও পর্যটক নেই সেখানে।
রাতারগুল গ্রামের বাসিন্দা সোনা মিয়া নৌকা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, ‘কিছু পর্যটক এসেছেন। তবে বৃষ্টির কারণে সেটা আশানুরূপ নয়। মূলত ঈদ-পরবর্তী দিনগুলোর জন্য অপেক্ষায় থাকেন নৌকার মাঝিরা। ওই সময়েই সবচেয়ে ভালো ব্যবসা হয়, কিন্তু এবার হয়নি।’
সিলেট পর্যটন শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি ট্যুর অপারেটর হুমায়ুন কবির লিটন বলেন, ‘কিছু পর্যটক সিলেটে এসেছেন। তারা বৈরী আবহাওয়ার জন্য সিলেটের চা-বাগান ঘুরে দেখছেন। অনেকেই হোটেলে থেকে খরচ না বাড়িয়ে চলে গেছেন, আবার কেউ কেউ বৃষ্টি উপেক্ষা করে পর্যটন কেন্দ্রে ঘুরেছেন। তবে অন্য ঈদের তুলনায় পর্যটকসংখ্যা একেবারেই কম ছিল। হোটেল মোটেলগুলোয়ও উপস্থিতি ছিল কম।’
সিলেটের শুকতারা রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক সুমন বলেন, ‘ঈদে আগ থেকেই রুম বুকিং হয়ে যেত। এবারো বুকিং ছিল। তবে বৈরী আবহাওয়ার জন্য কেউ কেউ বুকিং বাতিল করেন। তবু আমাদের রিসোর্টের সব রুম ছিল বুকড।’
জাফলং ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. রতন শেখ বলেন, ‘পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করছে।’
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুসিকান্তা হাজং বলেন, ‘পর্যটকের নিরাপত্তাসহ সব দিক বিবেচনায় সতর্ক উপজেলা প্রশাসন। নদের পানি বাড়লে যাতে তারা ঝুঁকি নিয়ে সেখানে যাতায়াত না করেন, এজন্য নৌকায় পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বৈরী আবহাওয়া ও পাহাড়ি ঢল থাকায় একটু স্রোত ছিল। এতে পর্যটক নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। বর্ষায় সাদাপাথর এলাকার দৃশ্য অনেক সুন্দর। তাই বলে ঝুঁকি নেয়া চলবে না।’
সিলেট জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে সাধারণত বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটে। এবার ছিল একটু ব্যতিক্রম। ঈদের আগ থেকেই সিলেটে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অন্য সময়ের তুলনায় সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপত্তাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভালো রয়েছে।’










