অর্থ সহজলভ্য হলে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, বেড়ে যায় মূল্যস্ফীতি। অর্থনীতির মৌলিক এ নীতির বড় সমালোচক তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতি বাড়ার প্রচলিত নীতিটি পশ্চিমাদের তৈরি মিথ। প্রচলিত বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
প্রেসিডেন্টের অভিনব তত্ত্বের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে তুরস্কের জনসাধারণকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় লিরার রেকর্ড দরপতন হয়েছে। একই সময়ে তুর্কিদের সইতে হয়েছে অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির চাপ। পাঁচ বছর আগে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৩ লিরা। বর্তমানে ১৮ লিরা ব্যয় করেও ১ ডলার সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। লিরার অব্যাহত দরপতনের পাশাপাশি অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে তুরস্কের মূল্যস্ফীতি। সরকারি হিসাবে জুনে এরদোগানের দেশে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। আর দেশটির অর্থনীতিবিদদের গবেষণা বলছে, আগের বছরের তুলনায় জুনে তুরস্কে জিনিসপত্রের দাম ১৭৫ শতাংশ বেড়েছে।
পরিস্থিতি তুরস্কের মতো না হলেও বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। সরকারি হিসাবেই মূল্যস্ফীতির হার ছুঁয়েছে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। যদিও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হার সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবেই এক বছরের ব্যবধানে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি বলছে, ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৩০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, তাতে আগামীতে মূল্যস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নের হার আরো চড়া হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে বাজারে অর্থের প্রবাহ কমার উদ্যোগ নিতে হবে। ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ বেঁধে রেখে সেটি সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতির হার বাড়ায় আমানতের সুদহারও বেড়ে গিয়েছে। এ অবস্থায় ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ অনেক ব্যাংকের জন্যই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তহবিল ব্যয় ব্যবস্থাপনা কমাতে ব্যাংকগুলো সিএমএসএমই ও রিটেইল ঋণ বিতরণ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে করপোরেট ঋণের বোঝা ব্যাংকগুলোতে আরো বড় হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে বেঁধে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি এখন বৈশ্বিক সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতিও এখন ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই। এ অবস্থায় পৃথিবীর প্রায় সব দেশই সুদহার বাড়াচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সুদহার না বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কমবে না।
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন মনে করেন, ঋণ ও আমানতের সুদহার বাজার পরিস্থিতির ওপর ছেড়ে দেয়া দরকার। সুদহার বাড়ানোর পরও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে প্রবৃদ্ধির পন্থা ভাবতে হবে। ব্যাংকগুলো এখন করপোরেট ঋণমুখী। ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার পরও এসএমই খাতের বিকাশ হয়নি। বড় করপোরেটগুলো কম সুদে আগের চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতে অসাম্য আরো বেড়েছে।
২০১৯ সালে তারল্য সংকট শুরু হয় বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে। বেশি সুদ দিয়ে হলেও আমানত সংগ্রহে মরিয়া হয়ে ওঠে ব্যাংকগুলো। অন্য ব্যাংকের আমানত ভাগিয়ে আনতে প্রতিযোগিতা শুরু করেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। আমানতের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বেড়ে যায় ব্যাংকঋণের সুদও। এসএমই ও রিটেইল খাতের ঋণের সুদহার উঠে যায় ১৫ শতাংশেরও বেশি। বেড়ে যায় করপোরেট ঋণের সুদহারও। এ অবস্থায় ঋণের পাশাপাশি আমানতের সুদহার বেঁধে দেয়ার নীতি গ্রহণ করে সরকার।
সরকারের নির্দেশনায় ২০২০ সালে ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহার বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই বছরের ১ এপ্রিল থেকে ঋণের সর্বোচ্চ সুদ ৯ শতাংশ কার্যকর হয়। করোনাভাইরাসে সৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগের সময় দেশের ব্যাংকগুলোতে জমা হয় অলস তারল্যের স্তূপ। বিশেষ ওই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশের বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংক মেয়াদি আমানতের সুদহার ২-৩ শতাংশে নামিয়ে আনে। এ অবস্থায় আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২১ সালের ৮ আগস্ট আমানতের সর্বনিম্ন সুদহার বেঁধে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তিন মাস ও এর বেশি মেয়াদি আমানতের সুদ কোনোভাবেই তিন মাসের গড় মূল্যস্ফীতির কম হতে পারবে না। এরপর চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত ও ঋণের সুদহারও বেঁধে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এক্ষেত্রে আমানতের সর্বোচ্চ সুদহার ধরা হয় ৭ শতাংশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ সুদ বেঁধে দেয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুনে দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির এ হার বিবেচনায় নিলে মেয়াদি আমানতের সুদহারও ধরতে হবে সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি। দেশের অনেক ব্যাংক এখন ৭ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশ সুদে মেয়াদি আমানত সংগ্রহ করছে। সংগৃহীত আমানতের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়। এ অবস্থায় বেশির ভাগ ব্যাংকের পক্ষেই ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ব্যাংক এখন সিএমএসএমই ও রিটেইল খাতের ঋণ বিতরণ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
ঋণের সুদহার বাড়ানোর পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর দাবিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারকে চিঠি দিয়েছে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। সংগঠনটির চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার স্বাক্ষরিত চিঠিতে বিলাসবহুল পণ্য উৎপাদন ও আমদানির ঋণ, অনুৎপাদনশীল ও আমদানিনির্ভর শিল্পঋণ, সিএমএসএমই ও রিটেইল খাতের ঋণের সুদহার বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর দাবিও তোলা হয়েছে বিএবির চিঠিতে। গত ১৯ জুলাই বিএবি থেকে এ চিঠি দেয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে (বিএবি) চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ৭-৮ শতাংশ সুদ দিয়েও ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না। মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহ ব্যয়ও বেড়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিলে সে ব্যাংককে অবশ্যই লোকসান দিতে হবে। এজন্য সব ঋণের সুদহার বেঁধে দেয়ার নীতি থেকে সরে আসতে বিএবির পক্ষ থকে গভর্নরের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। আশা করছি, বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্যোগ নেবে।
দেশের রিটেইল খাতের ঋণ বিতরণে নেতৃস্থানীয় ব্যাংক হলো বেসরকারি খাতের দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেড। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি নিজেদের রিটেইল ও সিএমএসএমই খাতের ঋণ বিতরণ কার্যক্রম কমিয়ে এনেছে। এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, সিটি ব্যাংকের অর্ধেক আমানত চলতি হিসাবের। এ কারণে আমাদের তহবিল সংগ্রহের ব্যয় তুলনামূলক কম। তার পরও রিটেইল ও সিএমএসএমই খাতের ঋণ বিতরণে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। এজন্য এ দুটি খাতের ঋণ বিতরণ কমিয়ে আনা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণের সুদহার বাড়ানো না হলে রিটেইল ও সিএমএসএমই খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে। ২০২১ সালের মে মাসে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ। চলতি বছরের মে মাসে এ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-মে মেয়াদে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে মাত্র ৮৬ হাজার ১১১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। গত বছরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংক থেকে নেয়া সরকারের ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। আমানত ও ঋণ প্রবৃদ্ধির বিপরীত চিত্র দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের তারল্য সংকটের শঙ্কা তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সুদহার বাড়ানোর চেয়ে ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোকে বেশি মনোযোগী হতে হবে। খেলাপি ঋণ কমানো না গেলে ঋণের সুদহার বাড়িয়ে লাভ হবে না। একটি বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের ব্যাংক খাতের খুঁটিনাটি সব বিষয়েই নজর রাখছে। পরিস্থিতির বিচারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের সুদহারের বিষয়টিও পর্যালোচনা করবে।










