দুই দশক আগে বাস্তবায়ন না হওয়া মিয়ানমার-চট্টগ্রাম পাইপলাইন প্রকল্পকে নতুন করে আলোচনায় এনে সে ব্যবস্থায় গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নিতে চায় বিএনপি সরকার।
সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে তার কার্যালয়ে গতকাল সাক্ষাৎ করেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ে। এ সময় নিজেদের চাহিদা মেটাতে পাইপলাইনের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আনার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করে বাংলাদেশ। এ প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বৈঠকে ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সে চাহিদা পূরণে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানিতে বাংলাদেশ আগ্রহী। পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।
২০০৫ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ইয়াঙ্গুনে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে গ্যাস পরিবহন নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হয়। মিয়ানমারের রাখাইন থেকে ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা হয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত একটি আন্তর্জাতিক গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে সম্মত হয় তিন দেশ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারত নিজ নিজ চাহিদা অনুযায়ী ওই পাইপলাইন থেকে গ্যাস নিতে পারত। এমনকি ভবিষ্যতে একই অবকাঠামো ব্যবহার করে গ্যাস আমদানি ও রফতানির সুযোগও ছিল। আন্তর্জাতিক একটি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে পাইপলাইন পরিচালনার বিষয়েও আলোচনা এগিয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আলোচনার একপর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের জন্য অতিরিক্ত কিছু শর্ত আরোপ করা হয়। ভারত সেগুলো প্রত্যাখ্যান করলে বাংলাদেশ ওই প্রকল্প থেকে সরে আসে। ফলে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা আর বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেনি এবং প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়। নিজেদের ভুল শোধরে হারানো সে সম্ভাবনাকেই নতুন করে কাজে লাগাতে চায় বর্তমান সরকার।
দুই দশক আগে প্রস্তাবিত মিয়ানমার-চট্টগ্রাম পাইপলাইন প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পাইপলাইনের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সে উদ্যোগ আবারো বিবেচনায় আনা যেতে পারে।’
জ্বালানি সহযোগিতা এগিয়ে নিতে দুই দেশের জ্বালানিমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেরও প্রস্তাব দেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। মিয়ানমারের জ্বালানিমন্ত্রীকে তিনি বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে নিজেও প্রতিবেশী দেশটি সফরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ করিডোরের সঙ্গে গ্যাস পাইপলাইন সংযুক্ত করা গেলে তা দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতাকে আরো শক্তিশালী করবে।’
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি ছাড়াও বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।’ জবাবে রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ে জানান, বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠকে বিষয়টি বিস্তারিত পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
এ সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ উপস্থিত ছিলেন।
দেশে বিদেশী বিনিয়োগ, স্থানীয় শিল্পের উৎপাদন স্থিতিশীল, নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সংকট। বিশেষ করে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়া, বিপরীতে এলএনজির বৈশ্বিক বাজারে ঊর্ধ্বমুখী দাম, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়াসহ নানা কারণে এ সংকটে পড়েছে দেশ। চাহিদা ও সরবরাহে বরাবরই ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকে। এর মধ্যে একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে ঘাটতি গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে। এ কারণে দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্প-কারখানা, আবাসিক ও সিএনজি স্টেশনগুলো তীব্র সংকটে পড়েছে।










