বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবনের বৈচিত্র্যময় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কটকা। সুন্দরবনের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত সমুদ্রসৈকতটি আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি। সাগরপাড়ের মানুষের কাছে এটি জামতলা সমুদ্রসৈকত নামেই অধিক পরিচিত। সৈকতে ঢেউয়ের আকার পরিবর্তনশীল। পূর্ব পাশে রয়েছে ঘন বন। তবে সাগরের ঢেউয়ে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে সূর্যাস্ত দেখার জন্য আদর্শ এ স্থানটি। এরই মধ্যে সাগরে বিলীন হয়ে গেছে বনরক্ষীদের ব্যারাক, চলাচলের রাস্তা, পুকুর, রেস্ট হাউজসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা ও গাছপালা।

সাগরপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, ক্রমান্বয়ে বঙ্গোপসাগরের ভাঙনে কটকার বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কটকা পর্যটন কেন্দ্রের বেশ কয়েকটি পাকা স্থাপনা, রাস্তা ও গাছপালা সাগরে বিলীন হয়ে গেছে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্টার মো. মতিউর রহমান জানান, দীর্ঘদিন ধরে সাগরের ভাঙনের কবলে রয়েছে কটকা বনাঞ্চল। প্রতিনিয়ত বনভূমি ও গাছপালা সাগরে বিলীন হচ্ছে। গত দুই বছরে বনরক্ষীদের দুটি ব্যারাক, একটি রেস্ট হাউজ ভবন, চলাচলের রাস্তা, একটি পুকুর এবং বিপুল পরিমাণ গাছপালা সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। কয়েকবার স্টাফ ব্যারাক স্থানান্তর করতে হয়েছে। ভাঙতে ভাঙতে কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে সাগর। এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে বর্ষা মৌসুমে বিদ্যমান ব্যারাক, অফিস ও রেস্ট হাউজ সাগরে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভাঙন রোধে কংক্রিট ব্লক ফেলা জরুরি হয়ে পড়েছে।

সুন্দরবনে ভ্রমণকারীদের কাছে জামতলা সমুদ্রসৈকত বেশ আকর্ষণীয়। তবে সৈকতটি জৌলুস হারাতে বসেছে বলে জানিয়েছেন পর্যটকরা। বিচে এখন তেমন বালি নেই; বিচটি অনেকটাই কর্দমাক্ত হয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক কারণে বিচের বালি জোয়ারের পানিতে সুন্দরবনের ভেতরে সরে গেছে।

পঞ্চগড় থেকে কটকা সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে এসেছেন মোজাম্মেল হোসেন। তিনি বলেন, ‘বিচের জৌলুস অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আগের সৌন্দর্য নেই। কর্দমাক্ত বিচে হাঁটাচলা করা কষ্টকর।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দিন দিন পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ছে সুন্দরবনের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কটকা। বালি সরে গিয়ে কর্দমাক্ত হয়ে পড়ছে সমুদ্রসৈকত। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ঢেউয়ের তীব্র আঘাতে সাগরে বিলীন হয়ে গেছে কটকায় অবস্থিত বনরক্ষীদের ব্যারাক, রাস্তাঘাট, গাছপালা, পুকুর ও রেস্ট হাউজসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা।

এ ব্যাপারে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে বঙ্গোপসাগরের ভাঙনের কবলে পড়েছে কটকাসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন বনাঞ্চল। কটকায় বেশ কয়েকটি পাকা স্থাপনা ও পুকুর সাগরে বিলীন হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সহায়তা চাওয়া হয়েছে। পাউবো কর্মকর্তারা ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে প্রস্তাব দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটকরা জানান, সৈকতের কিছু জায়গা বালির বদলে মাটি হয়ে গেছে। বিশেষ করে সূর্যাস্ত দেখার জায়গা থেকে বালি সরে গিয়ে মাটিতে পূর্ণ হয়ে গেছে। কাদামাটিতে হাঁটাচলা করা যায় না।’

মুন্সী মোহাম্মদ ওমর নামে এক পর্যটক বলেন, ‘সাগরের ঢেউয়ে ভাঙতে ভাঙতে কটকা পর্যটন কেন্দ্র বিলীনের পথে। পর্যটন কেন্দ্রে আগে প্রচুর পর্যটক আসতেন। কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে যেটুকু আছে তাও সাগরে বিলীন হয়ে যাবে।’

এ প্রসঙ্গে শরণখোলা ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রাসেল আহাম্মেদ বলেন, ‘কটকার একটি অংশে গাছপালা, রাস্তাঘাট ও বনরক্ষীদের অফিস ভেঙে সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। সৈকতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের বালি সরে গেছে। এখন সূর্যাস্ত দেখার জন্য পর্যটকদের কাদামাটির ওপর দাঁড়াতে হয়। এ কারণে কটকা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পর্যটকরা। এ ব্যাপারে সরকারও উদাসীন। এ অবস্থা চলতে থাকলে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।’