কিন্তু সে আনন্দঘন প্রত্যাশা নিমিষেই রূপ নিয়েছে শোক আর কান্নায়। এখন শুধু মরদেহগুলো দেশে ফিরে পাওয়ার আকুল অপেক্ষায় দিন গুনছেন শোকে কাতর হয়ে পড়া স্বজনরা।
গত মঙ্গলবার রাতে কলকাতার নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এ দুর্ঘটনায় শিশুসহ মোট নয়জন মারা যান। এদের মধ্যে বাংলাদেশী নাগরিক সাতজন। জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে কুষ্টিয়ার চারজন, সাতক্ষীরার দুজন ও সাভারের একজন ব্যবসায়ী রয়েছেন। প্রিয়জনদের আকস্মিক এ মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
কুষ্টিয়ার নিহত চারজন হলেন স্থানীয় সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৯), তার স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), ছেলে শর্ণশীষ দত্ত (৩) ও শ্বশুর আকরাম হোসেন (৬০)। তারা প্রায় ১৫ দিন আগে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতের কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিলেন। গত বুধবার সকালে তাদের বিমানে করে দেশে ফেরার কথা ছিল। দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলের লাশের ছবি দেখে মর্মান্তিক এ মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হন। দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত শোকে সম্পূর্ণ পাগলপ্রায়। তিনি বারবার বিলাপ করে বলছিলেন, ‘তার দেবা একটু পরেই ব্যাগ গুছিয়ে বাড়িতে ফিরে আসবে। এত দেরি কেন হচ্ছে?’
এদিকে দেবাশীষ দত্ত ও তার পরিবারের সদস্যদের মরদেহ আজ শুক্রবার দুপুরের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতে অবস্থানরত দেবাশীষ দত্তের আত্মীয় বণিক বার্তাকে এ তথ্য জানিয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে কুষ্টিয়ায় অবস্থানরত তার পরিবারও।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার মরদেহের অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর রাতেই শেষ কাজের ব্যবস্থা করা হতে পারে।
এদিকে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে জানান, মরদেহ সৎকারের জন্য এরই মধ্যে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেয়া হয়েছে।
তিনি আরো জানান, মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করবে জেলা প্রশাসন।
অন্যদিকে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার দুজন এ অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন। তারা হলেন তারালী ইউনিয়নের বরেয়া গ্রামের ঘের ব্যবসায়ী আলিমুজ্জামান সাজু (৪৫) ও তেঁতুলিয়া গ্রামের রেবতী সরকার (৩৬)। কোমরের ব্যথার চিকিৎসার জন্য সাজু ভারতে গিয়েছিলেন। গত বুধবার চিকিৎসা শেষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। মায়ের মৃত্যুর মাত্র এক বছর পর ছোট ভাইয়ের এ আকস্মিক মৃত্যুতে তার বড় ভাইয়েরা শোকে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
এদিকে রেবতী সরকারের স্বামী ও সন্তানরা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করায় তার তেঁতুলিয়ার বাড়িটি এখন নিস্তব্ধ ও শূন্য। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও বেশ অসচ্ছল। স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে গড়া ছোট্ট সংসারটি কীভাবে এ শোক সামলাবে, সেটাই এখন প্রতিবেশীদের মূল চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় নলতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান বলেন, ‘সাজুর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।’
সাভারের আমিনবাজার এলাকার বেগুনবাড়ির কসমেটিকস ব্যবসায়ী আহম্মেদ বাবুও (৩৭) এ অগ্নিকাণ্ডের শিকার হন। ব্যবসার মালামাল কেনার উদ্দেশ্যে তিনি গত সোমবার রাতে কলকাতায় যান। সেখানে একটি আবাসিক হোটেলে থাকা অবস্থায় মধ্যরাতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। হোটেল কক্ষে ঘুমানোর আগে বন্ধু ফয়সালের সঙ্গে তার শেষ টেলিফোন আলাপ হয়েছিল। বাবু তখন জানিয়েছিলেন তিনি খুব ক্লান্ত, তাই সকালে কথা বলবেন। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই তার মৃত্যুর সংবাদ আসে।
বাবুর দুই শিশুসন্তান মেয়ে এলিনা হাসান রোজা (৮) ও ছেলে সোয়াত (৫) বাবাকে না পেয়ে বারবার কেঁদে চলেছে। স্ত্রী গুলশানারা বুবলি চাকরির কারণে বাইরে ছিলেন। বাসার লোকজন তার অসুস্থতার কথা বলে তাকে দ্রুত বাসায় ডেকে আনেন। আমিনবাজারের বাড়িতে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বাবুর বন্ধুরা ও প্রতিবেশীরা তাদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন।
নিহতদের স্বজন ও প্রতিবেশীরা বলছেন, একেকটি পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম বা প্রিয় মানুষগুলোকে এভাবে হারানো কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন ছিল ও কীভাবে এ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটল, তা দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত কারণ প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে নিহতদের মরদেহগুলো দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।
কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহা জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের বাড়ি পরিদর্শন করে স্বজনদের সমবেদনা জানানো হয়েছে। মরদেহ দেশে আনতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। প্রিয় মানুষগুলোর মরদেহ শেষবারের মতো দেখার জন্য এখন শুধুই প্রহর গুনছে শোকার্ত পরিবারগুলো।










