একটি শিশুর আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় হাতেখড়ি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা সাংবিধানিক অধিকারও বটে। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে ১৯৯০ সালে আইন প্রণয়ন করে সরকার। আইন অনুযায়ী ৬-১০ বছর বয়সের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপ্ত করা বাধ্যতামূলক। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল অবৈষম্যমূলক সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিভিন্ন সময়ে সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাও করা হয়েছে। তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাড়ায়। ১১টি পাড়ায় ৬৫৮টি পরিবার বাস করলেও সেখানে রয়েছে একটিমাত্র সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ব্যক্তি উদ্যোগে তিনটি পাড়ায় বিদ্যালয় স্থাপন করা হলেও সেগুলো চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এতে প্রাথমিক শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখা সূত্রে জানা গেছে, মিরসরাইয়ে রয়েছে ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাড়া। এগুলো হলো খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব মসজিদ্দিয়া, মিরসরাই রিজার্ভ ত্রিপুরা পাড়া, মিরসরাই চৌধুরী ত্রিপুরা পাড়া, করেরহাট ইউনিয়নের সাইবেনিখিল ত্রিপুরা পাড়া, কালাপানি ত্রিপুরা পাড়া, কয়লা মগপাথর ত্রিপুরা পাড়া, কয়লা পশ্চিম সোনাই ত্রিপুরা পাড়া, কয়লা গোলছড়ি ত্রিপুরা পাড়া, নলখো ত্রিপুরা পাড়া, কয়লা খামারবাড়ি ত্রিপুরা পাড়া, খৈয়াছড়া ইউনিয়নের নাইয়াধলা ত্রিপুরা পাড়া। এগুলোর মধ্যে পূর্ব মসজিদ্দিয়া ত্রিপুরা পাড়ায় ১০০টি পরিবার বাস করছে। এসব পরিবারে স্কুলে যাওয়ার মতো শিশু রয়েছে ১০০টি।

এছাড়া কয়লা পশ্চিম সোনাই ত্রিপুরা পাড়ায় ১৯টি পরিবারে স্কুলে যাওয়ার মতো শিশু রয়েছে ৬০টি। সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। রিজার্ভ পাড়ায় ৯৫টি পরিবারে স্কুলে যাওয়ার মতো শিশু রয়েছে ৭০টি, চৌধুরী ত্রিপুরা পাড়ায় ৫২টি পরিবারে শিশুর সংখ্যা ৩০, সাইবেনিখিল ত্রিপুরা পাড়ায় ১১০টি পরিবারে ২০০, কালাপানি ত্রিপুরা পাড়ায় ৭০টি পরিবারে ১৩০, কয়লা মগ পাথর ত্রিপুরা পাড়ায় ৩৬টি পরিবারে ৩৫, কয়লা গোলছড়ি ত্রিপুরা পাড়ায় ২০টি পরিবারে ২৫, নলখো ত্রিপুরা পাড়ায় ১১১টি পরিবারে ১৫০ ও কয়লা খামার পাড়া ত্রিপুরা পাড়ায় স্কুলের যাওয়ার মতো শিশু রয়েছে ৩৬টি।

পাড়াগুলোর মধ্যে নলখোতে করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন, সাইবেনিখিল পাড়ায় ডা. জামশেদ, সাংবাদিক শারফুদ্দীন কাশ্মির ও মিরসরাই রিজার্ভ ত্রিপুরা পাড়ায় ডা. জামশেদ ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তবে আর্থিক দৈন্যে বিদ্যালয়গুলো চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। রিজার্ভ ত্রিপুরা পাড়ায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত রয়েছে। বর্তমানে ওই বিদ্যালয়ে ৫৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

সরকারি সুযোগ-সুবিধা না থাকায় পাড়ার শিশুরা বিদ্যালয়ে আসতে চায় না বলে দাবি করেন পাড়াপ্রধান উত্তম ত্রিপুরা। তিনি বলেন, ‘আমাদের পাড়া থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব¡প্রায় দেড় কিলোমিটার। সড়ক না থাকায় শিশুরা বিদ্যালয়ে যেতে চায় না। ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করা হলেও সেটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাড়াগুলো থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব এক থেকে পাঁচ কিলোমিটার। সাইবেনিখিল ও নলখো পাড়া থেকে করেরহাট কেএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। একজন শিক্ষার্থীকে পাড়া থেকে সরকারি বিদ্যালয়ে যেতে খরচ হয় প্রায় ১০০ টাকা। তাই জনবহুল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাড়াগুলোয় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন পাড়ার বাসিন্দারা।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আদিবাসী ফোরামের সভাপতি উষা ত্রিপুরা বলেন, ‘মিরসরাইয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাড়াগুলো থেকে সরকারি বিদ্যালয়গুলো অনেক দূরে। ফলে এসব পাড়ার ছেলেমেয়েরা পড়ালেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বেসরকারিভাবে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হলেও সেগুলো বেহাল।’

এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম ফজলুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত সময়ে মিরসরাইয়ে নতুন আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাড়া থেকে কোনো আবেদন জমা পড়েনি। তবে ওইসব এলাকায় বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা বিদ্যালয়গুলোকে আমরা নিয়মের মধ্য থেকে সহযোগিতা করছি।’