উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা পলি জমে ভরাট হচ্ছে মৌলভীবাজারের প্রধান তিনটি হাওর হাকালুকি, কাউয়াদিঘী ও হাইল হাওরের তলদেশ। এরই মধ্যে ভরাট হয়ে অস্তিত্ব হারিয়েছে এসব হাওরের বেশ কয়েকটি খাল-বিল। এতে হুমকিতে পড়েছে হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে সংকটে পড়বে হাওরের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবিকা।

সম্প্রতি সরজমিনে দেখা যায়, শুকনো মৌসুম শুরুর আগেই কাউয়াদিঘী ও হাইল হাওরের অধিকাংশ বিল শুকিয়ে গেছে। সেখানে গরু-মহিষ চরাচ্ছে স্থানীয়রা। বছরের এ সময়ে যে পরিমাণ পানি থাকার কথা তার অর্ধেক পরিমাণও নেই। আবার সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে যাওয়া বিলে সোনালি ধানের হাসি। দেখে বোঝার উপায় নেই একসময় এগুলো গভীর পানির আধার ছিল।

স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে কাগজে-কলমে থাকা বিলগুলোর অস্তিত্ব এক যুগ আগেও ছিল। কিন্তু অনেক বিল এখন অস্তিত্বহীন। যেসব বিল ভরাট হয়েছে, সেখানে এখন চাষাবাদ হয়। বর্ষায় এসব বিল এলাকায় পানি থাকলেও শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে যায়। কয়েক বছর আগেও এমন সময় পানি থাকত, মাছ ধরা পড়ত, পাখি বসত। কিন্তু ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে এখন শুকনো মাঠের আকার ধারণ করেছে। বিলের নিচু অংশে কিছু স্থানে ধান চাষ হয়। স্থানীয়রা গরু-মহিষ চরায়। বিলের অনেক জায়গা দখল করে অনেকে ফসল ফলায়।

স্থানীয়দের মতে, বিল ভরাটের কারণে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। আগে শাপলাসহ অনেক জলজ উদ্ভিদ দেখা যেত, যা এখন নেই। মৎস্যজীবী মুহিবুর রহমান বলেন, ‘বিল ভরাট হওয়ায় মাছ কমে গেছে। সারা দিন মাছ ধরে যে অর্থ মেলে তাতে সংসার চলে না। সেজন্য পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন জেলেরা। টিকে থাকা বিলগুলো খনন না করলে ভবিষ্যতে হাওরের ওপর নির্ভরশীল মানুষ বেকার হয়ে পড়বে।’

মৎস্য ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিলগুলো ভরাট হয়ে ধান চাষ হচ্ছে। ভূমি ক্রমেই চলে যাচ্ছে মানুষের হাতে। এতে সরকার বিল ইজারার কোটি কোটি টাকার রাজস্ববঞ্চিত হবে। বিলগুলো খনন করা দরকার। না হলে একদিন হাওর অস্তিত্ব হারাবে। সংকটে পড়বে হাওরের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষ।’

সরকারি তথ্যমতে, কাউয়াদিঘী হাওরের মোট আয়তন ১৫ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে রাজনগর উপজেলায় ১২ হাজার ও সদর উপজেলায় তিন হাজার হেক্টর। হাইল হাওরের মোট আয়তন ১২ হাজার ৫০ হেক্টর। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১০ হাজার ৫০ ও সদর উপজেলায় পড়েছে ২ হাজার হেক্টর। বর্ষায় হাওরের এ আয়তন অনেক বেড়ে যায়। জেলার সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি। প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর আয়তনের হাকালুকি, বর্ষাকালে সংলগ্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে এর আয়তন দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৭০০ হেক্টরে। এ সময় পানির গভীরতা হয় ২-৬ মিটার। হাওরের ৮০ ভাগ মৌলভীবাজার জেলায় এবং ২০ ভাগ সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। মৌলভীবাজারের বড়লেখা অংশে ৬০ ভাগ, কুলাউড়ায় ১২ ও জুড়ী উপজেলায় ৮ ভাগ রয়েছে। হাওরে ছোট-বড় ২৩৮টি বিল রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার অংশে ২০০টি, বাকি ৩৮টি সিলেট অংশে।

তবে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের হিসাবমতে, হাইল হাওরের আয়তন মোট ১৫ হাজার ১৩৮ হেক্টর। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪ হাজার ৯১৮ ও শ্রীমঙ্গলে ১০ হাজার ২২০ হেক্টর। কাউয়াদিঘী হাওরের আয়তন ১৫ হাজার ১৫৮ হেক্টর।

জেলা মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, হাকালুকি হাওরের ২৩৮টি বিলের মধ্যে সম্পূর্ণ ভরাট হয়েছে কমপক্ষে ২১টি বিল। বর্তমানে টিকে থাকা ২১৭টি বিলের মধ্যে বড়লেখায় ১২০টি, কুলাউড়ায় ৪৫, জুড়ীতে ১৫, ফেঞ্চুগঞ্জ ২২ ও গোলাপগঞ্জ ১৫টি। তবে এগুলোর অধিকাংশ আংশিক ভরাট হয়েছে।

সম্পূর্ণ ভরাট হওয়া বিলের মধ্যে কুলাউড়া উপজেলার মেদি বিল, ধলিয়া হাওর বিল, চিকনমাটি বিল, আদা চাপড়া বিল, বিলাইয়া বিল ও বইশমারা বিল; জুড়ী উপজেলার তুরল বিল, হুগলা বিল, লামা তুরল, উপর তুরল, লাড়ির ডাক ও বালিয়াজুড়ি এবং বড়লেখা উপজেলার মালাম বিল, ফুয়ালা বিল, জল্লা বিল, বালিয়া বিল, মাইজলা বিল ও হাওরের খাল অন্যতম।

তাছাড়া হাওরের উল্লেখযোগ্য বড় বিলগুলোর মধ্যে চাতলা বিল, চকিয়া বিল, পিংলারকোনা বিল, ফুটি বিল, তুরল বিল, তেকুনি বিল, পাওল বিল, জুয়ালা বিল, কাইয়ারকোনা বিল, বালিয়াজুড়ি বিল, কুকুরডুবি বিল, কাটুয়া বিল, বিরাই বিল, রাহিয়া বিল, চিনাউরা বিল, দুধাল বিল, মায়াজুরি বিল, বারজালা বিল, পারজালা বিল, মুছনা বিল, লাম্বা বিল, দিয়া বিল, তুরল বিল, গড়কুড়ি বিল, রঞ্চি বিল, পলভাঙা বিল, জুড়ী বিল, মালাম বিল, হিংলি বিল ও ডুলা বিল অন্যতম। এর মধ্যে অধিকাংশ বিল আংশিক ভরাট হয়েছে। আবার কয়েকটি বড় বিল অর্ধেকের বেশি ভরাট হয়ে কোনোভাবে অস্তিত্ব টিকে আছে।

একই চিত্র অন্য দুই হাওর কাউয়াদিঘী ও হাইল হাওরের। কাগজে-কলমে হাইল হাওরে ১৩০ ও কাউয়াদিঘী হাওরে ৭০টি বিল রয়েছে। এর মধ্যে কতটি বিল ভরাট হয়েছে সে তথ্য কারো কাছে নেই। তবে স্থানীয়ভাবে জানা যায়, প্রায় অর্ধেক বিল সম্পূর্ণ ও আংশিক ভরাট হয়েছে। তিন হাওরে মোট ৪৩৮টি বিলের মধ্যে মাছ চাষের জন্য সরকারি ইজারার তালিকায় রয়েছে ২৪৫টি বিলের নাম। হাওরের যেসব বিলের আয়তন ২০ একরের বেশি সেসব বিল তিন বছরের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ইজারা দেয়া হয়। এছাড়া ২০ একরের কম আয়তনের বিলগুলো উপজেলা ভূমি অফিস থেকে এক বছরের জন্য ইজারা দেয়া হয়। ধরে নেয়া হয় ইজারার তালিকায় থাকা বিল ছাড়া বাকি বিলগুলো অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে।

একই অবস্থা হাওরাঞ্চলের নদী-ছড়া-খালের। সরকারি ও স্থানীয় তথ্যমতে, হাকালুকির সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রায় ১০টি ছোট-বড় নদী। এর মধ্যে জুড়ী নদী, কণ্ঠিনালা, মরা জুড়ী, ফানাই, নিকড়ি, ষাটমা, বরুদল, বিলাম ও সুনাই অন্যতম। তবে বর্তমানে টিকে আছে জুড়ী উপজেলার জুড়ী ও কণ্ঠিনালা, কুলাউড়ার ফানাই এবং বড়লেখার সুনাই নদ। বাকিগুলো পরিণত হয়েছে ছোট খালে। হাকালুকি হাওরের বিশাল জলরাশির মূল উৎস এ নদ-নদীগুলো। এ জলরাশি হাওরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত কুশিয়ারা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। বাকি দুই হাওরের পানিও একই নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ নদ-নদীগুলোর উৎস পাহাড় থেকে। তাই প্রতি বছর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে প্রচুর পলি ও বালি আসে হাওরে, যা বিলগুলো ভরাট করে দেয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর ও সেন্টার ফর ন্যাচারাল স্টাডিজ (সিএনআরএস) ২০০৩-১৮ সাল পর্যন্ত হাকালুকিতে যৌথভাবে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। সেই প্রকল্পের তথ্যমতে, একসময় এ হাওরকে ঘিরে ছিল ছোট-বড় তিন শতাধিক ছড়া ও খাল। বর্তমানে প্রবাহ চলমান ছড়া আছে প্রায় ৮১টি। বাকিগুলো বিলীন হয়েছে। বিলীন হওয়া ছড়া-খালের মধ্যে সারর খাল, চান্দর খাল, গোগালী ছড়া, কচমার খাল, লামাই লঙ্গির খাল, জামলার খাল, কাটুয়া খাল ও পনার খাল উল্লেখযোগ্য।

পরিবেশ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের সহকারী পরিচালক মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি মানুষের অধিক চাপ, প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারসহ অনেক কারণ রয়েছে। মৎস্য বিভাগ, বন বিভাগের বন্যপ্রাণী বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সবাই মিলে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। সেটা করতে আমরা চেষ্টা করছি।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের জানামতে ৪০ শতাংশ বিল সম্পূর্ণ ও আংশিক ভরাট হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে মৎস্য উৎপাদনে। একটা সময় হাওরে দেশীয় ২৬০ প্রজাতির মাছ ছিল। বর্তমানে হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতি।’ মাছের স্থায়ী অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানোর কথা জানান এ কর্মকর্তা।

বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার বলেন, ‘হাওর ভরাটের কারণে ভারসাম্য হারাচ্ছে হাওরের পরিবেশ। মাছ ও জলজ উদ্ভিদ কমায় খাদ্য সংকটে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে পরিযায়ী পাখি। বিলগুলো খনন করা জরুরি।’

মৌলভীবাজারে হাওর নিয়ে কাজ করে হাওর রক্ষা আন্দোলন নামে একটি সামাজিক সংগঠন। তাদের তথ্যমতে, বর্তমানে জেলায় বিদ্যমান তিনটি হাওর থাকলেও একসময় ৩০টির বেশি হাওর ছিল। পাহাড়ি ঢলে পলি জমে ও মানুষের বহুমুখী চাপের কারণে বাকি হাওরগুলো রূপান্তর হয়েছে ধানি জমিতে। আবার জনবসতিও গড়ে উঠেছে কোথাও কোথাও। হাওর না থাকলেও সেই হাওরগুলোর নাম টিকে আছে এখনো।

সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘী ও হাইল হাওরসংলগ্ন এলাকায় কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উদ্যোগ নিয়েছে। কাউয়াদিঘী, হাইল হাওর ও আথানগিরি পুবের হাওরে অপরিকল্পিত সোলার প্যানেল প্রকল্প স্থাপন উদ্যোগ এবং হাওর-প্রতিবেশ রক্ষার দাবিতে ২২ নভেম্বর ‘হাওর রক্ষা আন্দোলন’ মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গোলটেবিল বৈঠক করে। হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সোচ্চার রয়েছেন পরিবেশকর্মীরা। বৈঠকে অতিথি হিসেবে জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আরিফ হোসেন ও মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ বিন অলিদ বক্তব্য দেন।

বক্তারা বলেন, সম্প্রতি ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়াই কাউয়াদিঘী, হাইল হাওর ও পুবের হাওরে কৃষিজমি ক্রয়-বিক্রয় এবং সেখানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ উদ্বেগ বাড়িয়েছে। উন্নয়ন অবশ্যই জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ রক্ষা করে হতে হবে; হাওর ও ভূপ্রকৃতি ধ্বংস করে নয়।

হাওর রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব খসরু চৌধুরী অভিযোগ করেন, জমি ও জলাধার ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় এবং ব্যক্তিস্বার্থ হাওরের সুরক্ষাকে বিপন্ন করছে। ভূমি সংস্কার আইনে ব্যক্তিমালিকানার সর্বোচ্চ সীমা ৬০ বিঘা নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে শত শত একর হাওরের জমি ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর হলো সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

বৈঠকে জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল জানান, হাওরের বিলগুলো খনন করা প্রয়োজন। সরকার সে বিয়ষগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন—বাপা মৌলভীবাজারের সভাপতি আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘বাংলাদেশের জলজ উদ্ভিদ প্রজাতির অর্ধেকেরও বেশি হাকালুকি হাওরে জন্মে। হাওর তীরের প্রায় দুই লাখ মানুষ জীবন-জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ হাওরের ওপর নির্ভরশীল। হাকালুকি হাওরে ১৫০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছের মধ্যে বর্তমানে ১১২ প্রজাতি টিকে আছে। ৫২৬ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে ১২০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ ও সরীসৃপ এখন বিলুপ্তপ্রায়। এখানে প্রতি বছর শীতকালে প্রায় ২০০ বিরল প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আসত। এখন আর আসে না। একই অবস্থা বাকি দুই হাওরের। বিল-খাল-নদী ভরাটের ফলে জীববৈচিত্র্য টিকতে না পারায় হারিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে এখনই ব্যবস্থা নেয়া দরকার।’