২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতন ও পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। সেই ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ, গণভোট ও ফলাফলের খবর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ হয়েছে। রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, আল জাজিরা, এনডিটিভি, আরব নিউজ, হিন্দুস্তান টাইমস, ডনসহ বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী গণমাধ্যম দিনব্যাপী এটিকে প্রধান খবর হিসেবে প্রচার করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের সময় থেকে অধিকাংশ গণমাধ্যমই লাইভ ব্লগে খবরটি সম্প্রচার করেছে। গতকাল নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও গণমাধ্যমগুলোতে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
বাংলাদেশের ভোটগ্রহণ ও ফলের পুরো প্রক্রিয়া লাইভ সম্প্রচার করছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বাংলাদেশের রহমানের সঙ্গে কথা বলেছেন, নির্বাচন জয়ে জানিয়েছেন অভিনন্দন’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাধারণ নির্বাচনে তারেক রহমানের দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের রহমানের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ২০ বছর পর ক্ষমতায় ফিরতে যাওয়া রহমানের দল এ নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পেয়েছে। রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি শিগগিরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন।’
‘বাংলাদেশের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির প্রধান অগ্রাধিকার’ শীর্ষক আরেক প্রতিবেদনে বিএনপি প্রদত্ত নির্বাচনী ইশতাহারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো তুলে ধরে রয়টার্স।
ভোটের ফলে বিএনপির জয়কে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি। ভোটগ্রহণ থেকে শুরু হওয়া লাইভে নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা, জননিরাপত্তা ও অর্থনীতি পর্যালোচনা করে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ করছে গণমাধ্যমটি। লাইভে তাদের শিরোনাম, ‘বাংলাদেশে ভোট গণনায় এগিয়ে বিএনপি, দ্বিতীয় স্থানে জামায়াতে ইসলামী’।
আল জাজিরা তাদের লাইভ সম্প্রচারের শিরোনাম দিয়েছে ‘নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দাবি বিএনপির, সরকার গঠনের প্রস্তুতি’। আনুষ্ঠানিক না হলেও প্রাথমিক এ ফলাফলকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে অভিহিত করেছে কাতারভিত্তিক এ গণমাধ্যম।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রধান সংবাদে ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফল। ‘হাসিনা-পরবর্তী প্রথম নির্বাচনে বিএনপির জয়ের দাবি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে গণতন্ত্রের পরীক্ষা বলে উল্লেখ করেছে গার্ডিয়ান।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সিএনএন তাদের অনলাইন প্রতিবেদনে বলেছে, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে বিএনপি। প্রায় দুই দশক পর দলটি আবার ক্ষমতায় ফিরছে এবং দলের নেতা তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর দেশ যখন পুনর্গঠনের পথে, তখন এ বিজয়কে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও নিহত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান তারেক রহমানের সামনে তাৎক্ষণিক কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘ অস্থিরতার পর দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে পুনর্গঠন করা। ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তার প্রভাব এখনো অর্থনীতি ও শিল্প খাতে বিদ্যমান।’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আরেক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপি এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘বিএনপি দাবি করেছে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে তারা বিজয় অর্জন করেছে। এর ফলে দলটি পরবর্তী সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে এবং বছরের পর বছর তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিতর্কিত নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পুনর্গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তারা সংসদে এককভাবে সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পেয়েছে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।’
জার্মানির আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থা ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে নির্বাচনে কোন দল কতটি আসনে জয়লাভ করেছে, তার পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন বলা হয়, ‘নির্বাচনে বিএনপি পরিষ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে রয়েছেন। নির্বাচনে মোট ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।’
বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করছে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির বিজয় তাদের কাছে বিস্ময়ের। গণমাধ্যমটির সংবাদে গুরুত্ব পেয়েছে, ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা নেতার নেতৃত্বে বিএনপির জয়।
‘ব্যবধান বাড়াচ্ছে বিএনপি, দুই আসনেই জয়ী তারেক, তবে হচ্ছে না কোনো বিজয় মিছিল! গণনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিবৃতি জামায়াতের’—এমন শিরোনামে খবর প্রকাশ করছে ভারতীয় বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা।
ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমস নির্বাচনের ফলাফল ও প্রভাব নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নির্বাচনী জয়ের পর বিএনপি আবারো শেখ হাসিনার ভারত থেকে দেশে প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।’
পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলোর প্রধান প্রতিবেদনেও রয়েছে বাংলাদেশের নাম। দেশটির প্রধান ইংরেজি দৈনিক ডন বাংলাদেশের নির্বাচন ও ফলাফল নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘বাংলাদেশে বড় জয় পেল বিএনপি, স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘বিএনপি নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এ ফলাফলের মাধ্যমে দীর্ঘ কয়েক মাসের অস্থিরতার পর দেশে স্থিতিশীলতা ফেরার আশা করা হচ্ছে, যা ২০২৪ সালে জেন জি নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর তৈরি হয়েছিল।’














