অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে রংপুর নগরে মাটি, পানি, বায়ু, শব্দদূষণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। পরিবেশ বিপর্যয় রোধে এবং পরিবেশ দূষণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের আইনি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২০১০ সালে প্রতি জেলায় পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় সরকার। সেইসঙ্গে আইন লঙ্ঘনকারীদের পাঁচ বছরের সাজা ও সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে পরিবেশ আদালত আইন-২০১০ অনুমোদনও দেয়া হয়। তবে ১৫ বছর পর হলেও রংপুরে স্থাপন হয়নি আদালত। ফলে দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তর অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকাও রাখতে পারছে না। কিছু মামলা হলেও তা পরিচালিত হচ্ছে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে। মামলার চাপে সেগুলোও সঠিক সময়ে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবেশবিদরা বলছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে জনবসতিও বাড়ছে। এসব জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করছে কিছু প্রতিষ্ঠান। যার ব্যাপ্তি ঘটছে কখনো কখনো আবাসিক এলাকাতেও। এ অবস্থায় চারপাশ দূষণমুক্ত রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিক বিদ্যমান আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরিবেশ দূষণ করে চলেছে। পরিবেশ আদালত গড়ে উঠলে ভোগান্তিতে পড়তে হতো না রংপুর বিভাগের মানুষকে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) আইনজীবী এস হাসানুল বান্না বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পরিবেশ, প্রকৃতি, নদ-নদী, খাল-বিল শুধু দূষণ নয়, দখলও হচ্ছে। ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে প্রভাবশালীরা আইনের তোয়াক্কাও করছেন না। সংবিধান ও প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে। এ কারণে রংপুরে পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। এটি প্রতিষ্ঠা হলে বিচারিক কার্যক্রম সহজ হবে। দখলদার উচ্ছেদ, দূষণের উৎস চিহ্নিতকরণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত, সংস্কার ও পুনরুদ্ধারে পরিবেশ আদালতের বিচারিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের আট জেলায় পলিথিন উৎপাদন, শব্দদূষণ, অবৈধ ইটভাটা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অনিয়মে মামলা হয়েছে ২৭টি। তবে এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র সাতটি। বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে ২০টি মামলা। প্রতিটি মামলা ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং ২০১৯ সালের ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
পরিবেশ বিপর্যয় রোধ এবং পরিবেশ দূষণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যত্যয় ও অপরাধের আইনি কার্যক্রম পরিবেশ আদালত আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়ায় নতুন আঙ্গিকে আইন প্রণয়ন জরুরি অনুভব করে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের ১৯ জুলাই প্রতিটি জেলায় পরিবেশ আদালত স্থাপনের ঘোষণা দেয় সরকার। তবে ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও রংপুরে পরিবেশ আদালত স্থাপন করা হয়নি। এ আদালত না থাকায় দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তর অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। কিছু মামলা হলেও তা পরিচালিত হচ্ছে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে।
এ ব্যাপারে রংপুর জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. আফতাব উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে পরিবেশবিষয়ক মামলাগুলো পরিচিত হচ্ছে চিফ জুডিশিয়াল (আমলি) আদালতে। এখন যিনি বিচারক আছেন তাকে অন্যান্য মামলাও পরিচালনা করতে হয়। কিন্তু যখন পরিবেশ আদালত হবে, এর বিচারক পরিবেশবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হবেন। পরিবেশ আদালত হলে মামলার জটও অনেক কমে যাবে। এছাড়া প্রতিটি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।’
নগরবাসী বলছেন, দ্রুত নগরায়ণের কারণে রংপুর শহরে শব্দদূষণ বাড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত নীরব এলাকা ঘোষণা করলেও তা শুধু কাগজ-কলমে রয়েছে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশের মাইক ওই সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে বায়ুমান পরীক্ষায় রংপুর বিভাগ প্রায় সময় দূষিত বায়ুর শীর্ষে অবস্থান করছে। নগরায়ণের ফলে মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দূষণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এছাড়া অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে নগরীতে। তবে এগুলোর অধিকাংশেরই পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। দূষণ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত নয়, পরিবেশ আদালতের মাধ্যমে শক্ত পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে মনে করেন তারা।
সার্বিক বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগের পরিচালক নুর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে শুধু ঢাকা এবং চট্টগ্রামে পরিবেশ আদালত আছে। আমরা পরিবেশ-সংক্রান্ত মামলাগুলো চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে পরিচালনা করছি। এছাড়া বিভাগের আট জেলায় প্রতি মাসে ২৪-৩০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, পরিবেশ আদালত গঠন হলে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হতো এবং মামলার জট কমে যেত।










