সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে চট্টগ্রামসহ ১৬টি জেলায় পাঁচ বছর মেয়াদি সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট (এসসিএমএফ) গ্রহণ করে সরকার। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও তিন ভাগের এক ভাগ কাজও শেষ হয়নি। চলতি জুনে প্রকল্পের মেয়াদ নতুন করে দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজ চলমান থাকলেও এখনো ভূমি অধিগ্রহণ শুরু করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। জমিসংক্রান্ত জটিলতা সমাধান করতে না পারায় অনেক জায়গায় ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার থেকে শুরু করে অনেক অবকাঠামো ও কারিগরি কাজ শুরুই করা সম্ভব হয়নি। কাজ শুরু না হওয়ায় নতুন মেয়াদে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে বেশ আগেই। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন করে গুছিয়ে কাজগুলো সম্পন্নের চেষ্টা করছি। ভূমি অধিগ্রহণসহ অন্য কাজগুলো দ্রুত শেষ করা হবে। চট্টগ্রামসহ বেশকিছু জায়গায়, যেখানে জমি নিয়ে কোনো সংকট হয়নি, সেখানে অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষের পথে। তবে বরিশাল, খুলনা অঞ্চলের কিছু জায়গায় জমি নিয়ে জটিলতা রয়ে গেছে। এ কারণে প্রকল্পের অধীনে বেশকিছু জায়গায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া যারা অর্থায়ন করছে তাদের নানা শর্ত মেনে কাজ করতে হচ্ছে। নতুন করে যে সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে তার মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করাটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।’
সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সমুদ্র থেকে মৎস্য শিকার করে আনা হলে জাহাজগুলো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ল্যান্ডিং নিয়ে আসবে। এ কারণে যে ১৬টি জেলায় এ প্রকল্পটির কাজ করা হচ্ছে সেখানে ১৮টি ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার (ফিশ মার্কেট), ১৬টি মেরিন ফিশারিজ সার্ভিলেন্স সেন্টারসহ ফিশ কোয়ারেিন্টন ল্যাব, ফিশ ডায়াগনস্টিক ল্যাব, রেফারেন্স ল্যাব, ব্রুড (চিংড়ি মাছ) ম্যানেজমেন্ট সেন্টার, পিসিআর ল্যাব আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে এ অবকাঠামো নির্মাণে যে পরিমাণ জায়গা দরকার তা পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কিন্তু এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মূলত প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই ভালোভাবে না করার কারণে প্রথম দফায় সময়সীমা পার হয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ অনেক বাকি রয়ে গেছে। নতুন করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, তাতে নতুন জটিলতার কারণে প্রকল্পটি নতুন সময়সীমার মধ্যে শেষ হবে কিনা সেটা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা গেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদ ধরা হলেও কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের মে মাসে। প্রকল্পটির বরাদ্দ ধরা হয় ১ হাজার ৮৬৮ কোটি ৮৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। প্রকল্পটি পাসের জন্য ২ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও একনেকে ৪৯৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা কমিয়ে পাস করা হয় ২০১৮ সালে। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ১ হাজার ৫৮৮ কোটি ৩৯ লাখ ৫ হাজার এবং বাংলাদেশ সরকার ২৮০ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করে। চলতি জুনে প্রকল্পটির নতুন করে দুই বছর সময় বাড়ানো হয়।
চার ভাগে ভাগ করে প্রকল্পটি চট্টগ্রাম, খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের ১৬টি জেলা, ৭৫টি উপজেলা ও ৭৫০টি ইউনিয়নে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মজুদ নির্ধারণ এবং জাতীয় ফিশারিজ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা হবে। বাণিজ্যিক ট্রলার এবং ১০ হাজার যান্ত্রিক নৌকায় জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো হবে। চিংড়ি উৎপাদন ২০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ১২৯টি উপকূলীয় খাল (প্রায় ৫০০ হেক্টর) খনন করা হচ্ছে। উপকূলীয় ৪৫০টি মৎস্য গ্রামে কমিউনিটি সেভিংস গ্রুপ প্রতিষ্ঠা, ১০০টি মডেল গ্রাম তৈরি, উপজেলা জেলে ফেডারেশন প্রতিষ্ঠাসহ ৫৪ হাজার জেলেকে আর্থিক সুবিধার আওতায় আনা হবে প্রকল্পটিতে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত কোনো বড় প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করা হয়। কিন্তু ২ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প গ্রহণের পর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গিয়ে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। এ কারণে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। প্রকল্পটির শুরুর দিকে বেশ অগ্রগতি দেখা গেলেও মূলত ২০২১ সালে কভিড-১৯-এর কারণে কাজ বন্ধই ছিল। এসব কারণে জমি অধিগ্রহণ কিংবা অবকাঠামো নির্মাণে বেশি সময় চলে গেছে। তবে কভিডের পর প্রকল্পকাজ দ্রুত করা হয়। এখন যে কাজ বাকি তা পাঁচ বা সাত বছরের মধ্যে শেষ করা সম্ভব নয়।
প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ড. আব্দুল আলীম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পে অবকাঠামো নির্মাণে বেশকিছু জায়গায় ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা আছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। যেহেতু এখনো বিষয়টি সমাধান হয়নি, সে কারণে অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া বাকি কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে। নতুন কাজ শুরু হলে সেখানে কিছু জটিলতা থাকবেই। আশা করছি প্রকল্পের দায়িত্বে যারা আছেন তারা দ্রুতই
শেষ করবেন।’










