রাজবাড়ীর পাংশা ও বালিয়াকান্দি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ভেজাল গুড়ের কারখানা। চিনি, রঙ, সোডা, ফিটকিরি ও কেমিক্যাল মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে গুড়। প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে অন্তত ২০০ মণ। এ গুড়গুলো যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।

সরেজমিন বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের হুলাইল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ওই গ্রামের বশির উদ্দিন শেখের ছেলে মিনাল শেখ গড়ে তুলেছেন ভেজাল গুড়ের কারখানা। সেখানে চার-পাঁচজন শ্রমিক কাজ করছেন। ভারতের এলসি গুড়, পানি, চিনি সঙ্গে আখের পচা গুড় ও গাদ মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ঝকঝকে গুড়। এসব গুড় স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যেই। পাশাপাশি যাচ্ছে বিভিন্ন জেলার বাজারে।

কারখানার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা বিল্লাল শেখ বলেন, ‘এই গুড় স্বাস্থ্যসম্মত। সবাই আসেন। তারা পরীক্ষা করে চলে যান। কিছু খরচ দিতে হয়, আবার গুড়ও নিয়ে গেছে কয়েকজন। ভালোই চলছে এই কারখানা।’

পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের চরঝিকড়ী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক থেকে একটু দূরে বাঁশ বাগানের মধ্যে বিশাল করে গড়ে উঠেছে ভেজাল গুড় কারখানা। তার পাশেই আরেকটি কারখানা। কারখানার চুলা কিছু সময় আগেই বন্ধ করা হয়েছে। পানি, চিনি, রঙসহ রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে তৈরি গুড় টিনের পাত্রে রাখা হয়েছে। চারপাশে নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। গুড়ের পাত্রের মধ্যে টিকটিকি, মাছি মরে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা আলেয়া বেগম বলেন, ‘ভেজাল গুড় কারখানার মালিক মানিকগঞ্জের আলমাস। এখানে দেখাশোনা করেন আলমাসের ছেলে ফারুক ও স্থানীয় প্রভাবশালী মনোয়ার হোসেন মিন্টু। এ কারণে এলাকার লোকজন তাদের কিছু বলতে সাহস পায় না।’

স্থানীয় গুড় ব্যবসায়ী একেএম মামুন জানান, আসলে তারা গুড় তৈরি করেন না। স্থানীয় আখচাষীদের কাছ থেকে গুড় কিনে আকিজ গ্রুপ, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, কুমিল্লা, সাভারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করেন। তারা ভেজাল গুড় তৈরির সঙ্গে জড়িত নন।

স্থানীয় হযরত আলী, জালাল উদ্দিনসহ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ‘ভেজাল গুড়ের কারখানার কারণে এলাকায় বসবাস করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। পচা গুড়ের গন্ধে ও মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে। কারখানার কালো ধোঁয়ায় গাছপালা মরে যাচ্ছে। চিনিতে পানি, রঙ দিয়ে তৈরি ভেজাল গুড়। এ গুড়ের ওপর ইঁদুর, টিকটিকি, তেলাপোকা মরে পড়ে থাকে। এ গুড় খেলে রোগে আক্রান্ত হতে হবে। জেনে শুনে তো আর এ গুড় খেতে পারি না। সম্প্রতি প্রশাসন দুটি গুড়ের কারখানায় অভিযান চালায়। জরিমানা নিয়ে চলে যাওয়ার পর আবার তা চালু হয়েছে।এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ এ গুড়ের কারখানা চলে আসছে।

ভেজাল গুড় কারখানার দায়িত্বরত মনোয়ার হোসেন মিন্টু জানান, ভারতের এলসি গুড় সংগ্রহ করে তার সঙ্গে চিনি, ফুড কালার মিশিয়ে গুড় তৈরি করেন। এ গুড়কে দোজ্বালি বলা হয়। প্রতিদিন ৩০ কেজির আড়াইশ টিন গুড় তৈরি করেন। ৭০ টাকা কেজি দরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন। তবে তিনি দাবি করেন এ গুড়ে কোনো ক্ষতি নেই।

পাংশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আবু দারদা বলেন, ভেজাল গুড়ের কারখানায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করাসহ বন্ধ করা হয়েছে। তার পরও যদি পুনরায় চালু করে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রাজবাড়ী সিভিল সার্জন ডা. এসএম মাসুদ বলেন, ‘কেমিক্যাল মেশানো খাবার খেলে ক্যান্সার, লিভার, কিডনি, চামড়ার সমস্যাসহ নানা ধরনের জটিল রোগ হতে পারে। এসব খাবার খাওয়ার বিষয়ে সবার সচেতন থাকা জরুরি।’