চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মোংলা বন্দর থেকে যশোরের আফিল গ্রুপের আমদানি করা ১ হাজার ১৬০ টন কয়লা নিয়ে একটি জাহাজ রওনা দেয় নওয়াপাড়া নৌ-বন্দরের উদ্দেশ্যে। ৪ মার্চ সেখানে পৌঁছার পর তলা ফেটে জাহাজটি ডুবে যায়। এভাবে গত পাঁচ বছরে বন্দরটিতে অর্ধশত জাহাজ ডুবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আমদানিকারকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নওয়াপাড়া নৌ-বন্দরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ঘাটের কারণে নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে। যে কারণে ঘন ঘন জাহাজডুবির ঘটনা ঘটছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যশোরের নওয়াপাড়া নৌ-বন্দরে ১৬০টি ঘাটের মধ্যে ৬০টিই অবৈধ। এসব অবৈধ ঘাট থাকায় পলি জমে নদী ভরাট হয়ে ঘনঘন ঘটছে জাহাজ
দুর্ঘটনা।
খুলনার দীঘলিয়া উপজেলার মজুদ খাল থেকে যশোর সদর উপজেলার আফরা ঘাট পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার নদীতীরবর্তী এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছে নওয়াপাড়া নদীবন্দর। নদীর পশ্চিম তীর বরাবর যশোর-খুলনা মহাসড়ক হওয়ায় বেশির ভাগ ঘাট পশ্চিম তীরে গড়ে উঠেছে। মোংলাবন্দর থেকে নদীপথে এখানে কার্গো, বার্জ, বাল্কহেড ইত্যাদি নৌ-যানের মাধ্যমে সার, কয়লা, সিমেন্ট, খাদ্যশস্যসহ নানা ধরনের মালপত্র আমদানি ও রফতানি হয়। ঘাটকে কেন্দ্র করে নওয়াপাড়া বাজার শিল্পবাণিজ্য নগরীতে পরিণত হয়েছে।
নওয়াপাড়া নৌবন্দর সূত্রে জানা গেছে, এখানে ছোট-বড় মিলে ১৬০টি ঘাট রয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি ঘাট অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব অবৈধ ঘাটের বেশিরভাগ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেই। অনেক প্রভাবশালী প্রবহমান নদীতে ইট, বালি ও গাছ দিয়ে অবৈধ ঘাট করে জেটি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া অনেক শিল্প-কারখানার সীমানাপ্রাচীর নদী দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে। ওসব ঘাট ও সীমানাপ্রাচীরে নদীর পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এতে পলি জমে নদী ভরাট হচ্ছে। অবৈধ ঘাট উচ্ছেদের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ বার বার নোটিস দিয়েছে কিন্তু কেউ কর্ণপাত করেনি। যে কারণে অবৈধ ঘাট উচ্ছেদের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য সূত্রে জানা গেছে, শিগগিরই অবৈধ ঘাট ও জেটি উচ্ছেদ করা হবে।
নৌ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ঘাট নির্মাণে তীরভূমি ব্যবহার বাবদ বার্ষিক ইজারার হার প্রতি শতাংশ জমির জন্য ১ হাজার ৭২৮ টাকা। এছাড়া বাঁশের জেটিতে প্রতি বর্গমিটারে ৮৪ টাকা, কাঠের জেটিতে ১৪৪ এবং পাকা জেটিতে ২৭৬ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিটি ঘাট থেকে সরকার বছরে ৪-৫ লাখ টাকা ইজারা পায়। কিন্তু অনেক অবৈধ ঘাটমালিক নদীর তীরভূমি দখল করে ঘাট নির্মাণ করে দেদারছে মালাপত্র লোড-আনলোডের কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে সরকার হারাচ্ছে মোটা অংকের রাজস্ব।
বাংলাদেশ নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনের নওয়াপাড়া অঞ্চলের নেতা নিয়ামুল ইসলাম রিকো বলেন, নদী দখল করে অবৈধ ঘাট নির্মাণের কারণে ঘন ঘন নৌযান দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এ পর্যন্ত যত জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে তার সবকটি তলা ফেটে ডুবেছে। আর তলা ফাটার কারণ প্রবহমান নদী দখল করে ইট, বালি, গাছ দিয়ে জেটি নির্মাণ ও বিভিন্ন কারখানার সীমানাপ্রাচীর নদীর মধ্যে স্থাপন। ভাটার সময় ওইসব স্থাপনায় ধাক্কা লেগে জাহাজের তলা ফেটে ডুবে যায়। আমরা দ্রুত ওই সব স্থাপনার অপসারণ চাই।
নওয়াপাড়া পৌরসভার মহরহাটি এলাকায় অবস্থিত সরকার ট্রেডার্সের ঘাট অবৈধ হিসেবে নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ তালিকাভুক্ত করেছে। ওই ঘাটের মালিক আলমগীর সরকার বলেন, আমার ঘাটটি যে অবৈধ তালিকায় রয়েছে তা আমি জানি না। এ ব্যাপারে আমাকে কোনো নোটিস দেয়া হয়নি। আমি নৌ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ঘাট করেছি। নৌ কর্তৃপক্ষ যদি আমাকে উচ্ছেদ করে, তার করুক।
নওয়াপাড়া নদীবন্দরের উপপরিচালক মাসুদ পারভেজ বলেন, বন্দরে ১৬০টি ঘাট রয়েছে, এর মধ্যে বৈধ আছে ১০০টি এবং ৬০টি অবৈধ। নদী দখল করে নির্মাণ করা অননুমোদিত এসব ঘাট করে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। যে কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা। আমরা অবৈধ ঘাটের তালিকা করে সংশ্লিষ্টদের উচ্ছেদে নোটিস দিয়েছি। কিন্তু কেউ কর্ণপাত করছে না। বাধ্য হয়ে আমরা এসব অবৈধ ঘাট উচ্ছেদের জন্য চেষ্টা করছি। গত মাসে উচ্ছেদের তারিখ নির্ধারণ হয়েছিল কিন্তু সিলেট এলাকায় বন্যা আসায় তা পিছিয়ে গেছে। আশা করছি, কোরবানির ঈদের পর ওই সব অবৈধ ঘাট উচ্ছেদে অভিযান চালাতে পারব।










