সুদানে সন্ত্রাসীদের হামলায় ছয় বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) শনিবার এক বার্তায় এ কথা জানায়। আইএসপিআর জানায়, সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয়জন শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আটজন। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ চলমান রয়েছে।
সুদানের আবেইতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ছয় বাংলাদেশী সেনা সদস্যের বাড়িতে এখন শোকের ছায়া। নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষা করছে তাদের পরিবার।
সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে বিধবা করে চলে গেলেন সবুজ
হামলায় নিহত হয়েছেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর সবুজ মিয়া। তিনি মিশনে লন্ড্রি কর্মচারীর দায়িত্ব পালন করতেন। নিহত সবুজ মিয়া উপজেলার মহদীপুর ইউনিয়নের আমলাগাছী (ছোট ভবনপুর) গ্রামের মৃত হাবিদুল ইসলামের ছেলে।
মহদীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফিরোজ আকন্দ বলেন, ‘প্রায় সাত-আট বছর আগে সবুজ মিয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে লন্ড্রি কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবুজ মিয়া ছিলেন ছোট। তিনি এক বছর আগে বিয়ে করেন। তিন মাস আগে ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন, পরে আবার যোগ দেন কর্মস্থলে। ছেলের মৃত্যুর খবরে মা ছকিনা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তার স্ত্রীর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।’
মাকে ভালো থাকতে বলে নিজেই চলে গেলেন মাসুদ
একই মিশনে নিহত হন নাটোরের লালপুর উপজেলার আরবাব ইউনিয়নের বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের সেনা সদস্য করপোরাল মাসুদ রানা (৩০)। তার মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে বইছে শোকের মাতম। মাসুদ রানা লালপুর উপজেলার আরবাব ইউনিয়নের বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের সাহার উদ্দিনের ছেলে।
নিহতের পরিবার জানায়, তিন ভাইয়ের মধ্যে মাসুদ রানা ছিলেন সবার বড়। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। মা মর্জিনা খাতুন ছেলের মৃত্যুর খবরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কালই (শনিবার) ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। ডিউটির কষ্টের কথা জানতে চাইলে সে বলল, মা এখন আর কষ্ট নাই, ডিউটি কম। আমাকে ভালো থাকতে বলে ছেলে নিজেই চলে গেল।’
নিহতের স্ত্রী আসমাউল হুসনা আঁখিও স্বামীর মৃত্যুসংবাদে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। কথা বলতে গিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনিও।
বাবার কবরের পাশে দাফনের অপেক্ষায় শান্ত
সেনা সদস্য শান্ত মন্ডল (২৬) ও মো. মমিনুল ইসলাম (৩৮) ওই সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হয়েছেন। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা নিজ নিজ পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন।
জানা গেছে, সেনা সদস্য শান্ত মন্ডলের গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাটমাধাই ডারারপাড় গ্রামে। শান্ত ২০১৮ সালে সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন। তিনি সর্বশেষ বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে সৈনিক পদে ছিলেন। গত ৭ নভেম্বর তিনি শান্তিরক্ষী মিশনে সুদানে যান। শান্তর বড় ভাই সোহাগ মন্ডল বলেন, ‘শনিবার সন্ধ্যায় শান্ত ভিডিও কলে বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলেছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে খবর পাই ওদের ক্যাম্পে হামলা হয়েছে। আমরা এখন তার মরদেহের অপেক্ষায় আছি। বাড়িতে বাবার কবরের পাশে তাকে কবর দিতে চাই।’
শনিবার শেষবার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন মমিনুল
নিহত মমিনুল ইসলামের বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পান্ডুল ইউনিয়নের পারুলেরপাড় গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে। শনিবার বিকালে ভিডিও কলে বাড়ির সবার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয় তার। এরপর রাত ১১টার দিকে তার মৃত্যুর খবর জানতে পারে পরিবার।
মমিনুলের বাবা আব্দুল করিম বলেন, ‘আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন বলেই হয়তো তার শহীদি মৃত্যু হয়েছে। এখন আমরা তার মরদেহের অপেক্ষায় আছি।’
একমাত্র ছেলেকে রেখে দেশ ছেড়েছিলেন জাহাঙ্গীর
সুদানে নিহত জাহাঙ্গীর আলম কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামের আকন্দ বাড়ির হযরত আলীর ছেলে। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেস ওয়েটার পদে কর্মরত ছিলেন। পরিবার জানায়, স্ত্রী আর তিন বছরের একমাত্র ছেলে ইরফানকে রেখে দেশ ছেড়েছিলেন নিহত জাহাঙ্গীর আলম। জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুর খবরে তারাকান্দি গ্রাম যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে, শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবারে।
জানা গেছে, তিন ভাইয়ের মধ্যে জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন মেজ। প্রায় ১১ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের স্বপ্ন নিয়ে এক মাস সাতদিন আগে সুদানে যান তিনি।
সব স্বপ্ন ভেঙে গেছে শামীমের বাবার
২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন শামীম রেজা। চলতি বছরের ৭ নভেম্বর তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে সুদানে যান। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে সন্ত্রাসী হামলায় তিনি নিহত হন। নিহত শামীম রেজার বাড়ি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার হোগলাডাঙ্গী গ্রামে। তার বাবার নাম আলমগীর ফকির। গতকাল তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানজুড়ে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। ঘরের বাইরে বসে বিলাপ করছেন পরিবারের সদস্যরা। সদ্য নির্মিত একতলা বাড়ির ভেতরে শোকাহত মা ও স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। শোকের ভারে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি দলের সদস্যরা এসেছেন। তারা পরিবারের লোকজনকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন।
নিহত শামীম রেজার বাবা আলমগীর ফকির কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার ছেলে দেড় বছর আগে বিয়ে করেছে। কত স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। অন্তত শেষবারের মতো আমার ছেলের লাশটা দেখতে চাই।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা।










