দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে আগামীকাল দেশে ফেরার কথা রয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। তার সঙ্গে ফেরার কথা রয়েছে তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা জারনাজ রহমানের। জুবাইদা রহমান সম্প্রতি ঢাকা ঘুরে গেলেও জাইমা দেশে ফিরছেন দীর্ঘদিন পর।

তাদের সঙ্গে থাকবেন তারেক রহমানের মিডিয়া টিমের প্রধান আবু আবদুল্লাহ সালেহ, পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট আব্দুর রহমান সানি ও তাবাসসুম ফারহানা নামে আরেকজন। তারেক রহমানের ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর দুই মেয়ে আগেভাগেই ঢাকায় এসে পৌঁছাবেন।

তারেক রহমানের মিডিয়া টিমের প্রধান আবু আবদুল্লাহ সালেহ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফেরার প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। সব ঠিক থাকলে ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার উদ্দেশে লন্ডন ছাড়ব আমরা।’

বিএনপি নেতারাও জানিয়েছেন, দেশে ফেরার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ট্রাভেল পাস হাতে পেয়েছেন তারেক রহমান। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের বিজনেস ক্লাসের টিকিটও বুক করেছেন তিনি। সব ঠিক থাকলে উড়োজাহাজটি আগামীকাল বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবে।

তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমান সরাসরি যাবেন এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার মা ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে। সেখান থেকে যাবেন রাজধানীর ৩০০ ফিটে সংবর্ধনাস্থলে। এরপর তার গুলশানের বাসভবনে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসতে পারে।

দেশে ফেরার পর যেকোনো সময় বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করতে যাওয়ার কথা রয়েছে তারেক রহমানের। বিএনপির একটি সূত্র জানায়, প্রত্যাবর্তনের পরদিন শুক্রবার তিনি সেখানে যেতে পারেন।

এরপর শনিবার তিনি ভোটার হওয়ার জন্য কার্যক্রম শুরু করবেন বলে জানানো হয়েছে দলের পক্ষ থেকে। গত সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে বৈঠক শেষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শনিবার ভোটার হওয়ার জন্য সব কার্যক্রম শুরু করবেন তারেক রহমান।

এদিকে দেশে ফেরা নিয়ে গতকাল ফেসবুকে দীর্ঘ একটি পোস্ট দিয়েছেন তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান। পোস্টে শিশু অবস্থায় তার দাদি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তোলা নিজের একটি ছবি সংযুক্ত করে আবেগঘন বার্তা লিখেছেন তিনি। সেই সঙ্গে দেশে ফিরে নিজের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন জাইমা। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘দেশে ফিরে ইনশা আল্লাহ, আমি দাদুর পাশে থাকতে চাই। এ সময়টাতে আব্বুকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চাই। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের জন্য সর্বস্ব দিয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে চাই।’

জাইমার ফেসবুক পোস্টটি শেয়ার করা হয়েছে বিএনপির অফিশিয়াল পেজ থেকেও। তার এ পোস্টকে অনেকে দেখছেন জাইমার রাজনীতিতে আসার ইঙ্গিত হিসেবে।

এদিকে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করতে নানামুখী প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি। এ উপলক্ষে সংবর্ধনাসহ বিভিন্ন আয়োজন বাস্তবায়নে আলাদা অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। তাকে স্বাগত জানাতে সর্বোচ্চ জনসমাগম ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পুরো প্রক্রিয়া সুশৃঙ্খল করার টার্গেট নিয়ে কাজ করছেন নেতারা। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার জন্য সরকারি বাহিনীর পাশাপাশি দল থেকেও নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। এছাড়া রাজধানীর ৩০০ ফিটে গণসংবর্ধনা দেয়ার জন্য মঞ্চ তৈরির কাজ করছে দলটি। গতকাল পর্যন্ত সেখানে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জার কাজ চলতে দেখা গেছে।

এরই মধ্যে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের অফিস থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি নিয়েছে বিএনপি। গত রোববার রাতে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কাছে এ-সংক্রান্ত অনুমতিপত্র পাঠিয়েছেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।

তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে রাজধানীতে কয়েক লাখ লোক সমাগমের আশা করছেন বিএনপি নেতারা। ঢাকার বাইরের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ এরই মধ্যে ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন। সংবর্ধনা ঘিরে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রতি। বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিটের গণসংবর্ধনা স্থান এবং গুলশান পর্যন্ত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অভ্যর্থনা কমিটির সদস্য সচিব বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘তারেক রহমানের দেশে ফেরা স্মরণীয় করে রাখতে কাজ করছে কমিটি। প্রতিদিন প্রস্তুতি সভা হচ্ছে।’

সোমবার রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের যাতায়াতের উদ্দেশে বিশেষ ট্রেন ও অতিরিক্ত কোচ বরাদ্দের জন্য আবেদন করা হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১০টি রুটে স্পেশাল ট্রেন পরিচালনা করা হবে এবং নিয়মিত চলাচলকারী একাধিক ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশেষ বরাদ্দ দেয়ার কারণে স্বল্প দূরত্বের রাজবাড়ী কমিউটার (রাজবাড়ী-পোড়াদহ), ঢালারচর এক্সপ্রেস (পাবনা-রাজশাহী) এবং রোহনপুর কমিউটার (রোহনপুর-রাজশাহী) ট্রেনের ২৫ ডিসেম্বরের যাত্রা স্থগিত রাখা হবে।

বিমানবন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত দলের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামছুল ইসলামকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তার নেতৃত্বে চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্সসহ (সিএসএফ) একাধিক টিম কাজ করবে।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একাধিকবার গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে, তারেক রহমান দেশে এলে তার নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ কোনো ঝুঁকির তথ্য নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার নিরাপত্তায় কোথাও যেন কোনো ফাঁক না থাকে, এ বিষয়টি জোরালোভাবে তদারকির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দেশে ফেরার পর তারেক রহমান যাতায়াতের সময় পাবেন পুলিশি পাহারাসহ বিশেষ নিরাপত্তা। এছাড়া তার বাসভবন ও অফিসেও থাকবে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়া কাউকে তার কাছে ভিড়তে দেবে না পুলিশ। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও গোয়েন্দারা তারেক রহমানের নিরাপত্তার দিকটি দেখভাল করবেন।

তারেক রহমানের দেশে আসার আগেই বিমানবন্দর থেকে তিনি যে পথে যাবেন সে পথে আগে থেকেই পুলিশের সোয়াত টিম, বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা কাজ শুরু করবেন। তার বাসা ও অফিস ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপিংয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে পুলিশ।

এছাড়া তারেক রহমানের ব্যবহারের জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করা বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন একটি বুলেট প্রুফ হার্ড জিপ গাড়ি দেশে আনা হয়েছে। তার নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের জন্য বুলেট প্রুফ বাসও দেশে এসেছে। বাসটি গত রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস হয়েছে।

এদিকে তারেক রহমানের দেশে ফেরার দিন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের কিছু এলাকার রফতানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায় ছুটি দিতে পরামর্শ দিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটির নোটিসে উত্তরা (পূর্ব-পশ্চিম), উত্তরখান, দক্ষিণখান, খিলক্ষেত, আব্দুল্লাহপুর, তুরাগ, টঙ্গী, পুবাইল, রূপগঞ্জ, কাঞ্চন ব্রিজ ও আশুলিয়া এলাকার (পূর্বাংশ) কারখানার মালিকদের বৃহস্পতিবার বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময় ২০০৮ সালে কারাগার থেকে বেরিয়ে চিকিৎসার জন্য সপরিবারে যুক্তরাজ্যে যান তারেক রহমান। এরপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান কয়েকবার দেশে আসতে পারলেও তারেক রহমানের ফেরা হয়নি।