রাজবাড়ীর ওপর দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা ও গড়াই নদী। জেলার বড় দুটি নদীর মধ্যে শুধু কালুখালী উপজেলার সাওরাইল ইউনিয়নের পাতুরিয়া বালুমহাল ইজারা দেয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে পদ্মার বালুমহালগুলো ইজারা দেয়া হয়নি। তার পরও প্রতিদিন কয়েক লাখ টন বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। এছাড়া বালিয়াকান্দি উপজেলার কোনাগ্রামে গড়াই নদীর চরে ড্রেজার বসিয়ে বালি তোলা হচ্ছে। এতে বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙনের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কৃষকরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে নদীতে প্রচুর পলি মাটি জমে, যা ফসল উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। পদ্মা ও গড়াই নদীর জেগে ওঠা চরে বাদাম, ভুট্টা ও মিষ্টি আলু চাষ হয়। তবে বালির সঙ্গে পলি মাটিও উত্তোলনের কারণে এসব আবাদ ব্যাহত হচ্ছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলার ধাওয়াপাড়ায় পদ্মা নদীর জেগে ওঠা চরে চাষ হচ্ছিল বিভিন্ন ধরনের ফসলের। ওইসব ফসলি জমি থেকে মাটি ও বালি বিক্রি করছে একটি চক্র। উপজেলা প্রশাসন জরিমানা করলেও কিছুক্ষণ পরই বালি তোলা হচ্ছে। এছাড়া কালুখালী উপজেলার সাওরাইল ইউনিয়নের পাতুরিয়া এলাকায় গড়াই নদীর বালুমহাল গত ৫ আগস্ট পর্যন্ত ইজারা ছাড়াই উত্তোলন করা হলেও একটি টাকাও সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। এ বালুমহালের পাশেই গড়াই নদীর ইসলামপুর চর থেকে ভেকু দিয়ে বালি তোলা হচ্ছে।
সদর উপজেলার ধাওয়াপাড়া ফেরিঘাট এলাকায় দুটি ভেকু দিয়ে বালি ও মাটি কেটে ট্রাক ভরা হচ্ছে। একটিতে স্তূপ করে রাখা বালি ও অন্যটিতে মাটি কেটে ভরা হচ্ছে। সেখানে ১০-১২টি ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল। বালি তোলার কাজ করছিলেন শিহাব শিকদার। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার বড় ভাই মালেক শিকদার বালি তুলছেন। প্রতি ট্রাক ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।’
কীভাবে তুলছেন জানতে চাইলে বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য বলেন শিহাব শিকদার। তবে এ বিষয়ে জানতে আব্দুল মালেক সিকদারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ প্রসঙ্গে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারিয়া হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পদ্মা নদীর বালি বিক্রির অভিযোগে মোবাইল কোর্টের অভিযানে জরিমানা করা হয়। বালি উত্তোলনকারীকে সতর্ক করা হয়েছে। এর পরও বালি বিক্রি করছে। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
অন্যদিকে বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের কোনাগ্রামে গড়াই নদীর চর থেকে প্রকাশ্যে বালি বিক্রি করা হচ্ছে। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ভেকুচালক বলেন, ‘প্রতিদিন ৫০-৬০ ট্রাক বালি তোলা হচ্ছে। তবে এখানে বেশি দিন আমরা বালি তুলছি না। এখান থেকে বাকসাডাঙ্গীর এক ব্যক্তি বালি উত্তোলন করেন। কোনো কথা থাকলে তার সঙ্গে বলেন।’
বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বালি উত্তোলন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে নতুন করে কেউ যদি এ কাজ করে থাকে তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গড়াই নদীর চর নিয়ে বিরোধের জেরে হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। এখন জোর করেই অন্য গ্রামের মানুষ এসে প্রতিদিন শত শত ট্রাক বালি নিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের লোক এলে কিছু সময় বন্ধ থাকে। চলে গেলে আবার শুরু হয়। এভাবে বালি উত্তোলনের কারণে বর্ষায় নদীভাঙন প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের গড়াই নদীপাড়ের বাসিন্দা তুহিনুর রহমান বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে নদীপাড়ের বালি কেটে নিয়ে যাওয়ায় বর্ষায় ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। পদ্মা ও গড়াই নদীর চরে বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ হয়। পলি মাটি কেটে নেয়ার কারণে চরের জমি উর্বরতা হারাচ্ছে।’
কালুখালী উপজেলার সাওরাইল ইউনিয়নের ইসলামপুরে গড়াই নদীর চর থেকে ট্রাকে করে বালি বিক্রি করা হচ্ছে। এখানে বালি তুলছেন বাবর বিশ্বাস। গ্রামের মধ্যে হওয়ায় এ কাজে কেউ বাধা দিতে পারছে না। প্রশাসনের লোকজনও এখানে আসেন না। তবে বাবর বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই বালি তুলছি। কী করব, যা বিক্রি হচ্ছে তা দিয়ে ছেলেমেয়ের খরচ চালানো মুশকিল।’
এ প্রসঙ্গে কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহুয়া আফরোজ বলেন, ‘এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’










