যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে। যেখানে চাহিদা রয়েছে ৩২ জনের, সেখানে কর্মরত মাত্র পাঁচজন। হাসপাতালের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী পরিচালকের প্রধান দুটি পদ এখনো সৃষ্টি করা হয়নি। বর্তমানে একজনকে সংযুক্তি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক পদটি পরিচালনা করানো হচ্ছে। চেইন অব কমান্ড দুর্বল থাকায় চিকিৎসা কার্যক্রমে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আবার যেসব বিশেষজ্ঞ কর্মরত তারাও ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন না। ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ব্যক্তিগত বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন কেউ কেউ। বিশেষজ্ঞরা শুধু খাতা-কলমে রয়েছেন। ইন্টার্নরাই এখন এ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মূল ভূমিকায়। সাধারণ রোগীদের সঙ্গে তারা খুবই রূঢ় আচরণ করেন।
ইন্টার্নরা ছাড়াও ওয়ার্ডবয়, আয়া ও ঝাড়ুদাররাও রোগীর চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, যশোর আড়াইশ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল শুরুর সময় থেকে একই চিকিৎসা কাঠামোই চলছে। মোট চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৫৪টি। কর্মরত আছেন ৪৯ জন। শূন্য রয়েছে পাঁচ চিকিৎসকের পদ। এর মধ্যে সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদ রয়েছে মাত্র তিনটি ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদ দুটি। অথচ ২০ বছর আগে যেখানে হাসপাতালটিতে ১০০ রোগী ভর্তি থাকত, এখন সেখানে ভর্তি ৫০০-৫৫০ জন রোগী। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার রোগী। যশোর জেলা ছাড়াও নড়াইল, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলা থেকে হাসপাতালটিতে রোগী আসেন। নতুন করে ৩২ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চাহিদা দেয়া হলেও তা দেয়া হচ্ছে ননা। যে কারণে রোগীরা সঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। জটিল রোগী এলেই চিকিৎসকরা রেফার করে দিচ্ছেন।
অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে সরকারি এ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবায় রয়েছে নানা অনিয়ম। কর্মরত বিশেষজ্ঞরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন না। মাঝে মাঝে ওয়ার্ড রাউন্ডে গেলেও তড়িঘড়ির কারণে রোগীরা ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না। তাদের অনিয়মের কারণে রোগীরা সরকারি হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। অনেকেই সরকারি হাসপাতাল ছেড়ে ক্লিনিকে চলে যেতে বাধ্য হন।
ডা. আবুল কালাম আজাদ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক পদে থাকাকালীন ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছিল কোনো ইন্টার্ন চিকিৎসক রোগীর মৃত্যু ঘোষণা দিতে পারবেন না। এছাড়া রোগীকে রেফার্ড ও ছাড়পত্র তারা দেবেন না। কিন্তু বর্তমানে সবকিছু চলছে আগের মতোই। গত ৫ নভেম্বর ছুরিকাহত হয়ে ভর্তি হন যশোর শহরতলির শেখহাটি নিমতলা এলাকার মৃত আতিয়ার রহমানের ছেলে আজগর আলী (৬০)। তার বুকের আঘাতটি গুরুতর হলেও কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাকে দেখতে আসেননি। পরে একজন ইন্টার্ন তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে দেন। ওই রোগীর স্বজনরা ওই সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, এক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আরেক মেডিকেলে রেফার করা সত্যিই দুঃখজনক। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অনিয়মের কারণে রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এতে আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে দুর্ভোগ বাড়ে। আজগার আলীর মতো একাধিক রোগীকে প্রতিদিন রেফার করছেন ইন্টার্নরা।
চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের সবজি বিক্রেতা রোকনুজ্জামান জানান, তার এক আত্মীয় কীটনাশক পান করে জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। দুদিন হাসপাতালে থাকলেও রোগী উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কারণ হিসেবে তিনি জানান, দুদিনই
ইন্টার্নরা তাকে চিকিৎসা দিয়েছেন। কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর কাছে আসেননি। বাধ্য হয়ে ওই রোগীকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
গত ২০ অক্টোবর শার্শা উপজেলার সাইফার রহমান নামে এক রোগীকে হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। রোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন, জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা ছাড়া সারাদিনে কোনো চিকিৎসক রোগীর কাছে যাননি। কোনো উপায় না পেয়ে রাতে হাসপাতালের সামনের একটি ক্লিনিকে রোগীকে ভর্তি করা হয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, হাসপাতালে জখমি রোগী দেখলেই এগিয়ে আসেন ওয়ার্ডবয়, আয়া ও ঝাড়ুদার। রোগীর স্বজনদের হাতে চিকিৎসাসামগ্রী কেনার শর্ট স্লিপ ধরিয়ে দেন। এরপর ইনজেকশন সিরিঞ্জ, স্যালাইন, সুঁই-সুতো নিয়ে তারাই
করেন চিকিৎসা। আবার ক্যানোলা, ইউরিন ব্যাগ, খাদ্য গ্রহণের পাইপ লাগানোর কাজও তারা করেন। এতে তারা লাভবান হন। কেননা প্রতি রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে হাসপাতালের কর্মীরা অর্থবাণিজ্য করেন। সার্জারি, মেডিসিন, গাইনি ওয়ার্ডে অধিকাংশ সময় চিকিৎসকের ভূমিকায় ওয়ার্ডবয় ও ঝাড়ুদারকে দেখা যায়। কাজ করেই তারা বলেন, আমরা বিনা বেতনে কাজ করি। এ বলেই টাকা দাবি করেন। দাবির চেয়ে টাকার পরিমাণ কম হলেই তার বেঁকে বসেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালের প্রধান দুটি পদ স্থায়ী করার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের কোনো সাড়া নেই। বছরের পর বছর পদ দুটিতে কোনো কর্মকর্তাকে সংযুক্তি করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক পদে একজন সংযুক্ত থাকলেও প্রায় দুই বছর সহকারী পরিচালক পদে কেউ নেই।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আরিফ আহমেদ জানান, ২০০৯ সালে হাসান আল মামুনকে তত্ত্বাবধায়ক (উন্নয়ন) পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর থেকে আর কেউ এ পদে আসেননি। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তত্ত্বাবধায়ক পদটি বিলুপ্ত করে। তিনি আরো জানান, হাসপাতালে সহকারী পরিচালকের পদ সৃষ্টি করা হয়নি। বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী পরিচালক পদটি পরিচালনা করা হয় অন্য কাউকে সংযুক্তি করে। প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ সৃষ্টির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সাড়া মেলেনি।
আরএমও ডা. আরিফ আহমেদ জানান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট রয়েছে। নতুন করে ৩২টি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ সৃষ্টির ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (সংযুক্তি) ডা. আখতারুজ্জামান জানান, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে গড়ে ৪৯০ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকেন। এত সংখ্যক রোগী স্বল্পচিকিৎসক দিয়ে সামাল দেয়া সত্যিই কষ্টদায়ক। গত মাসেও চিকিৎসক সংকট নিরসনে আরেকটি চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পূরণের পাশাপাশি নতুন পদ সৃষ্টি ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের সচিব-উপসচিবদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা দায়িত্বে অবহেলা করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।










