নদীবেষ্টিত জেলা রাজবাড়ী। যাকে ঘিরে রেখেছে প্রমত্তা পদ্মা। এছাড়া জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে গড়াই, চত্রা, চন্দনা, হড়াই, মরাকুমার, যমুনা, হাজরাখালি ও সিরাজপুরসহ ছোট-বড় নয়টি নদ-নদী। জীবিকার জন্য এ অঞ্চলের মানুষ নির্ভর করে পদ্মার ওপর। তবে নদীভাঙন জেলার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু বর্ষা মৌসুমে নয়, বছরজুরেই ভাঙন আতঙ্কে থাকেন পদ্মা নদীরপারের মানুষ।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) রাজবাড়ীর তথ্য বলছে, গত বর্ষা মৌসুমে জেলার নয়টি পয়েন্টে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। তখন ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে নয়টি প্যাকেজে জিও ব্যাগ ফেলা হয়। এর মধ্যে রাজবাড়ী সদর উপজেলায় তিনটি, গোয়ালন্দে দুটি আর বালিয়াকান্দি উপজেলায় চারটি প্যাকেজে কাজ করা হয়। রাজবাড়ীতে পদ্মা নদীর ৫৭ কিলোমিটার, গড়াই নদীর ৩৮ কিলোমিটার, যমুনার ১৩ কিলোমিটারসহ ১৫০ কিলোমিটার নদীপথ রয়েছে। যার মধ্যে রাজবাড়ী শহর রক্ষা বাঁধের কাছে স্থায়ীভাবে নদী শাসন কাজ হয়েছে সাত কিলোমিটার। আর পাংশা উপজেলার হাবাসপুরে স্থায়ীভাবে নদী শাসন করা হয়েছে আড়াই কিলোমিটার।

স্থানীয়দের দাবি, এখনো ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে রাজবাড়ী সদর উপজেলার গোদার বাজার, মৌলবী ঘাট, সিলিমপুর, মহাদেবপুর, গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া, দেবগ্রামও মুন্সি বাজার, কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া, বিকয়া, শাওরাইল, পাংশা উপজেলার হাবাসপুর, বাহাদুরপুর, কেওয়া গ্রাম, বালিয়াকান্দি উপজেলার পোটরা, জামসাপুর, পুশ আমলাসহ অন্তত ২০টি পয়েন্ট। পাংশা উপজেলার কেওয়া গ্রামে শুষ্ক মৌসুমে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

কেওয়া গ্রামের বাসিন্দা আলম মল্লিক বলেন, ‘কেওয়া গ্রামের মধ্য দিয়ে চলে গেছে গড়াই নদী। এপারে রাজবাড়ী ওপারে ডানে মাগুরা আর বামে ঝিনাইদহ জেলা। গত বর্ষা মৌসুম থেকেই কেওয়া গ্রামে ভাঙন শুরু হয়েছে। বার বার বলার পরও ভাঙন রোধে কোনো কাজ করেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। এখন যেভাবে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে, তাতে বর্ষা মৌসুমে বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।’

গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার এলাকায়ও একই অবস্থা। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বসতবাড়ি, কবরস্থান, মসজিদ, স্কুলসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

ওই এলাকার কৃষক হাবিল মিয়া বলেন, ‘গত বর্ষা মৌসুমে আমার প্রায় পাঁচ বিঘা ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। এলাকাবাসীর মানববন্ধন ও আন্দোলনের মুখে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে কিছু বালির বস্তা ফেলেছিল। ভাঙন একটু কমার পর আর কেউ খোঁজ নেয়নি।’

দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট এলাকার বাসিন্দা হারুন খাঁ বলেন, ‘৫ আগস্টের পর প্রভাবশালীরা দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ঘাটের কাছে বালি উত্তোলন করছে। গত মাসে মানববন্ধন করার পর বালি উত্তোলন বন্ধ হয়েছে। তবে যতটুকুই তারা কেটেছে তার মাশুল দিতে হবে বর্ষা মৌসুমে। ঘাটসহ শত শত বসতবাড়ি পদ্মা নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে যেসব এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল তার বেশির ভাগই নষ্ট করেছে স্থানীয় জেলেরা। নৌকা চালানোর কাজে ব্যাবহার করা লগি দিয়ে সব বস্তা ছিদ্র করেছে। পানি কমার ফলে যে বস্তাগুলো দৃশ্যমান হয়েছে। এক শ্রেণীর মানুষ বস্তাগুলো নিয়ে বিক্রি করছে। কেউ কেউ আবার সেগুলো দিয়ে বাজার করার ব্যাগ তৈরি করছে।

গোদার বাজার এলাকার বাসিন্দা ফারুখ হোসেন বলেন, ‘সবার সহযোগিতা না থাকলে নদীভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে না। এ কাজে নদীপারের মানুষকেই বেশি ভূমিকা রাখতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে পাউবো রাজবাড়ীর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এমএ শামীম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বর্ষা মৌসুমে রাজবাড়ীতে ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে নয়টি প্যাকেজে কাজ করা হয়েছে। এরই মধ্যে নদীভাঙন কবলিত এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে ভাঙন রোধে কোনো প্রকল্প চালু নেই। নদীপাড়ের জিও ব্যাগগুলো কেউ যাতে নিয়ে না যায়, সেজন্য মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও স্থায়ী ব্যানার টানানো হয়েছে।’