দেড় দশকেও শিল্পসহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়নি নোয়াখালী বিসিক শিল্পনগরীতে। জেলার সোনাপুরের এ বিসিক শিল্পনগরী এখন নামেই। গ্যাস, পানি সংকট, চুরি-ছিনতাই ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বরাদ্দ করা প্লটগুলো বছরের পর বছর খালি পড়ে আছে। হাতেগোনা চার-পাঁচটি কারখানা থাকলেও নানা সংকটের কারণে হতাশ এসব কারখানার মালিকরাও। অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি না থাকা ও উদাসীনতায় গড়ে উঠছে না ক্ষুদ্র শিল্প। যদিও সব দায় নিতে রাজি নয় শিল্পনগরী কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার সোনাপুরে বিসিক শিল্পনগরীতে অবকাঠামো গড়ে উঠলেও পরিত্যক্ত, খালি পড়ে আছে বেশকিছু প্লট ও ভাঙাচোরা সড়ক। আবার কোনোটিতে শিল্পের নামে শুধু স্থাপনা তৈরি হলেও নেই উৎপাদন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ঝুলছে তালা।

উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস, পানির সংকট ও কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার কারণেই পূর্ণতা পায়নি এ শিল্পনগরী। তার ওপর রয়েছে চুরি-ছিনতাই ও নিরাপত্তাহীনতা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাবার উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার জানান, গত দুই মাসে তাদের প্রতিষ্ঠানে তিনবার চুরি হয়েছে। চোরেরা নিয়ে গেছ বেশকিছু দামি ব্যাটারি ও মেশিন। শিল্পনগরী কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তারা জানিয়ে দিয়েছে নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের, তাদের নয়।

তারই পার্শ্ববর্তী অন্য এক তার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার জানান, প্রতিনিয়তই চুরি হচ্ছে। বিদ্যুতের লম্বা তার পর্যন্ত খুঁটি থেকে চুরি হচ্ছে, মিটার চুরি হচ্ছে। সন্ধ্যার পর বখাটেদের আড্ডায় অতিষ্ঠ তারা। দুই সপ্তাহ আগে তাদের প্রতিষ্ঠানের সব মাল রাতের আঁধারে চুরি হয়ে যায়। এখানে নিরাপত্তা প্রহরী নেই, পুলিশের কোনো টহল নেই। বারবার বিসিক কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।

শুধু এ দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী-কর্মকর্তাই বলেননি, গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির খবরে জড়ো হন অনেকে। প্রত্যেকেরই কথা চুরি ও ছিনতাইয়ে অতিষ্ঠ তারা।

নোয়াখালী বিসিক শিল্পনগরীর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও হাজী প্লাস্টিকের চেয়ারম্যান শহিদুল আলম জানান, সবচেয়ে বড় সংকট গ্যাসের। বিদ্যুতের সংকট কিছুটা কেটেছে। ভারি কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক পক্ষ এখানে শিল্প-কারখানা তৈরি করতে চাচ্ছে না। কারণ এখানে গ্যাস সংকট রয়েছে। যেটুকু গ্যাস পাওয়া যায়, তারও কোনো চাপ নেই। ফলে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে।

তার দৃষ্টিতে যুগপোযোগী শিল্পসহায়ক পরিবেশের পাশাপাশি বিসিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বল্প সুদে বড় অংকের ঋণ সহায়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তা গড়ে তোলা হলে এ শিল্পনগরী পূর্ণতা পাবে। তিনি আরো জানান, নোয়াখালী কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এখানে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা গড়ে তোলা উচিত। উদ্যোক্তারা যেন কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে তোলেন, সেই পদক্ষেপ নেয়া উচিত বিসিক কর্তৃপক্ষের। এ শিল্পনগরীকে পুরোদমে চালু করা গেলে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এতে করে বেকারত্ব দূরীকরণের পাশাপাশি আর্থসামাজিকভাবে আরো এগিয়ে যাবে এ জেলা।

বিসিক সূত্রে জানা যায়, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, উৎপাদন বৃদ্ধি ও বেকারত্ব দূরীকরণের উদ্দেশ্যে ২০০৩ সালে ১৫ একর জমিতে এ শিল্পনগরী স্থাপনের কাজ শুরু হয়, যা শেষ হয় ২০০৭ সালে। ১০৭টি প্লটের মধ্যে শুরুতেই শিল্প-কারখানা স্থাপনে ৬২টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। মামলাজনিত কারণে অর্ধনির্মিত অবস্থায় বন্ধ রয়েছে ১০টি। চলমান অবস্থায় বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত ১০টি। উৎপাদনযোগ্য রয়েছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে কিছু গ্রিল ওয়ার্কশপ রয়েছে চলমান। এ ছাড়া এ শিল্পনগরীতে উৎপাদনমুখী তেমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে।

কারখানা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেছেন এমন একাধিক প্রতিষ্ঠানপ্রধান জানান, এখানে শিল্পায়ন করার মতো তেমন কোনো সহায়তা নেই কর্তৃপক্ষের। নিরাপত্তা নেই, গ্যাস নেই, রয়েছে পানি সংকটও। সড়কগুলোর বেহাল দশা। ড্রেনগুলো ভেঙে গেছে। বর্ষায় কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এসব কারণেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন তারা।

নোয়াখালী বিসিক শিল্পনগরীর নানা সংকট নিয়ে কথা হয় ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মাহবুব উল্যাহ্র সঙ্গে। গ্যাসসহ কিছু সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, শিল্পনগরীতে গ্যাস পর্যাপ্ত রয়েছে, পাইপলাইনের কারণে চাপ কম রয়েছে। এ সংকট দূরীকরণে এরই মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে গ্যাস সংকট দূর হবে। এছাড়া পানি পর্যাপ্ত বলে দাবি করেন তিনি। চুরি ঠেকাতেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে শিল্পনগরী কর্তৃপক্ষের আলোচনা হয়েছে। এখানে নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষের এখানে কোনো উদাসীনতা নেই। নগরীর উন্নয়নে সর্বাত্মক কাজ করছে তারা। মূলত শিল্পনগরীর কিছু উদ্যোক্তা প্লট বরাদ্দ নিয়ে সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ করে, কিন্তু উৎপাদনে যায়নি। অনেকে আবার প্লট বরাদ্দ নিয়েও কোনো ধরনের কারখানা গড়ে তোলেননি। এগুলো নিয়ে ১০টির অধিক মামলা রয়েছে। এরই মধ্যে মামলায় শিল্পনগরীর পক্ষে আদালত রায় দিয়েছেন। শিগগিরই বরাদ্দকৃত প্লটগুলো বাতিল করে নিয়ম অনুযায়ী পুনরায় নতুন উদ্যোক্তাদের মাঝে বরাদ্দ দেয়া হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের মাঝে বরাদ্দ দিলে নোয়াখালী শিল্পনগরী পূর্ণাঙ্গভাবে জমে উঠবে এবং এ নগরী নিয়ে সরকারের যে লক্ষ্য তাও বাস্তবায়ন হবে।