দেশে ব্যাটারি শিল্পের পথিকৃত প্রতিষ্ঠান রহিমআফরোজ। ১৯৫৪ সালে এসি আবদুর রহিমের হাত ধরে জন্ম রহিমআফরোজ অ্যান্ড কোংয়ের। ২০১০ সালে গ্রুপটির অধীনে উৎপাদনে আসে আরজেড পাওয়ার। রহিমআফরোজের অন্যান্য ব্যবসার মতো সফলতা বিদ্যুৎ খাতে পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। আরজেড পাওয়ারের বিপুল পরিমাণ লোকসানের ঘানি টানতে গিয়ে একসময় গোটা গ্রুপই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

গোটা দেশ এখন বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চাহিদা মেটাতে রেশনিং করতে হচ্ছে সরকারকে। তবে এ পরিস্থিতিই এখন রহিমআফরোজের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ ঘাটতিতে দেশে ব্যাটারির চাহিদা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে রহিমআফরোজের ব্যাটারি ব্যবসা। বর্তমানে চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাটারি সরবরাহ দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে রহিমআফরোজকে।

রহিমআফরোজ সূত্র জানিয়েছে, ব্যাটারির ব্যবসা এখন ভালো হচ্ছে। যদিও আসন্ন শীতে চাহিদা কমতে পারে বিবেচনায় অতিরিক্ত ব্যাটারি উৎপাদন করে মজুদ করে রাখেনি রহিমআফরোজ। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বছরের এ সময়ে ব্যাটারি বা আইপিএসের বাড়তি চাহিদা দেখা যায় না। বিদ্যুতের চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে এখন ব্যাটারির চাহিদা বেড়েছে হঠাৎ করেই। আকস্মিক এ উল্লম্ফনের সঙ্গে সংগতি রেখে বাজারে ব্যাটারি সরবরাহের প্রস্তুতি ছিল না রহিমআফরোজের। এ কারণে এখন বাজারে চাহিদা অনুযায়ী ব্যাটারি সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। বর্তমানে বিদ্যমান এ বাড়তি চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছে রহিমআফরোজ। একই সঙ্গে সুদিন ফেরার প্রত্যাশায়ও রয়েছে গ্রুপটি।

একসময় দেশের ব্যাটারির বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল রহিমআফরোজের। অ্যাকুমুলেটর ব্যাটারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালেই দেশে ব্যাটারির বাজারের আকার ছিল ৮ হাজার কোটি টাকা, ১৫ শতাংশ হারে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় যা এখন ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এখন এ পণ্যের বাজারে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান জায়গা করে নিলেও উল্লেখযোগ্য অংশের দখলে রয়েছে রহিমআফরোজ।

জানতে চাইলে রহিমআফরোজের গ্রুপ পরিচালক নিয়াজ রহিম বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যাটারির ব্যবসা এখন ভালো অবস্থায়। এটি কোম্পানিকে নতুন লাইফলাইন দিতে পারে, যদি আমাদের প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের সংস্থান করা যায়। বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ কাজে লাগানো গেলে আমাদের অনেক সংকট নিরসন হতে পারে।

একসময় উৎপাদনের পাশাপাশি বহুজাতিক বিভিন্ন কোম্পানির ব্যাটারি বিপণনের মাধ্যমে দেশের ব্যাটারি বাজারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল রহিমআফরোজ। আইপিএস ও ইউপিএসের বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আমদানীকৃত গাড়ির টায়ার, লুব্রিক্যান্ট ও জ্বালানির বাজারেও দাপট ছিল গ্রুপটির। সোলার প্যানেল ও আগোরার মতো রিটেইল সুপারশপের মাধ্যমে গণমানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল রহিমআফরোজের নাম। কিন্তু এখন তীব্র অর্থসংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে শিল্প গ্রুপটিকে। যদিও প্রতিষ্ঠার পরবর্তী ৬০ বছরে উত্তরসূরিদের হাতে গ্রুপটির বিকাশ ও বিস্তৃতি হয়েছে ঈর্ষণীয় মাত্রায়। ব্যবসায়িক সততা ও কার্যকর সুশাসনের দিক থেকেও গোটা করপোরেট জগতে সুনাম ছিল রহিমআফরোজের।

ব্যবসায় ভরাডুবির কারণে স্থবিরতা নেমে এসেছিল রহিমা ব্যাটারির ব্যবসায়ও। ব্যাটারি উৎপাদন, বিপণন ও রফতানিতেও এর ছাপ পড়েছিল। কোম্পানি টিকিয়ে রাখতে রফতানির চিন্তা বাদ দিয়ে আপাতত ব্যাটারির স্থানীয় বাজার ধরে রাখাতেই মনোনিবেশ করেছে গ্রুপটি। বর্তমানে ব্যাটারির ব্যাপক চাহিদা মেটাতে স্বল্প পরিসরে তত্পর হয়েছে রহিমআফরোজ কর্তৃপক্ষ।

১৯৪০-এর দশকে সীমিত পরিসরে ট্রেডিং ব্যবসায় যুক্ত হন এসি আবদুর রহিম। ১৯৪৭ সালে যৎসামান্য পুঁজি নিয়ে চট্টগ্রামে গিয়ে ব্যবসার পরিধি বড় করেন তিনি। এরপর ১৯৫৪ সালের ১৫ এপ্রিল রহিমআফরোজ অ্যান্ড কোং নামে একটি কোম্পানি গড়ে তোলেন তিনি। ১৯৫৯ সালে তিনি দেশে যুক্তরাজ্যের লুকাস ব্যাটারির বিপণন শুরু করেন। বিপণন করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ডানলপ টায়ারেরও। লুকাস ব্যাটারি ও ডানলপ টায়ার বিক্রিতে বিপুল পরিমাণ মুনাফা করেন এ উদ্যোক্তা। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে লুকাস ব্যাটারি অধিগ্রহণের মাধ্যমে ব্যবসায় বড় সাফল্য আসে রহিমআফরোজের। ১৯৮২ সালে আবদুর রহিম মারা গেলে তার তিন সন্তান আফরোজ রহিম, ফিরোজ রহিম ও নিয়াজ রহিম ব্যবসার হাল ধরেন। পিতার রেখে যাওয়া কোম্পানি দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে আরো বড় হয়ে রূপ নেয় দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেটে।

১৯৮৫ সালে দেশে প্রথমবারের মতো ব্যাটারি উৎপাদন শুরু করে রহিমআফরোজ। একই বছর ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের সহায়তায় শুরু হয় সোলার পাওয়ার বিপণন। ১৯৯২ সালে সিঙ্গাপুরে ব্যাটারি রফতানির মাধ্যমে রহিমআফরোজের নাম বিদেশেও বিস্তৃত হয়। এরপর ১৯৯৩ সালে প্রথম আইপিএস চালু করে কোম্পানিটি। ২০০০ সালে ভারতের আহমেদাবাদে অফিস খোলে রহিমআফরোজ। ২০০১ সালে আগোরা নামের সুপারস্টোর চালু করে গ্রুপটি।

ক্রমবর্ধমান এ ব্যবসা ভরাডুবির মুখে পড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ করতে গিয়ে। গত বছর এ নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে রহিমআফরোজের গ্রুপ পরিচালক নিয়াজ রহিম বণিক বার্তাকে বলেছিলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে গিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছি। আগোরা করতে গিয়ে কৃষিতেও বড় অংকের বিনিয়োগ করেছিলাম। সেখানেও লোকসান হয়েছে ৭০-৮০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বাতাসে ভেসে গিয়েছে। এত বড় লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে করতেই ব্যবসায় আঘাত হেনেছে করোনা।

এছাড়া গ্রুপ পরিচালক নিয়াজ রহিমের অসুস্থতাও রহিমআফরোজের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। ২০১৩ সালে অনেকটা আকস্মিকভাবে গুলেনবারি সিনড্রোমে (জিবিএস) আক্রান্ত হন তিনি। এরপর প্রায় তিন বছর তিনি দেশে ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। দীর্ঘ এ সময়ে ব্যবসা থেকে পুরোপুরি বাইরে ছিলেন তিনি।