ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার জন্য তৈরি ‘রাক্ষুসে স্বৈরাচার’ মোটিফে আগুন লাগানোর ঘটনাটি সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ। শনিবার ( ১২ এপ্রিল) ভোর ৪টা ৪৪ মিনিট থেকে ৪টা ৪৮ মিনিটের মধ্যে দুর্বৃত্তটি মোটিফে আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায়। তবে তার পরিচয় এখনও শনাক্ত করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘কালো টি-শার্ট, বাদামি প্যান্ট, কালো স্যান্ডেল পরা এবং পেছনে চুলে ঝুঁটি বাঁধা এক যুবক চারুকলার তিন নম্বর গেট টপকে ভেতরে প্রবেশ করে। সে প্রথমে মোটিফের গায়ে তরল দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে দেয়। এরপর পর্দার আড়ালে গিয়ে লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর সে একই পথে ছবির হাটের দিকে পালিয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘শিল্পীরা গত দুই সপ্তাহ ধরে এ মোটিফ তৈরিতে লাগাতার পরিশ্রম করছেন। এটি একটি শৈল্পিক কাজ, যা মুহূর্তে পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমরা শিল্পীদের উপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি—তারা যদি পুনর্নির্মাণ করতে পারেন।’
চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম চঞ্চল বলেন, ‘ঘটনাটি ফ্যাসিবাদপন্থী কারো দ্বারা ঘটানো হয়েছে। এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সুপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদের পক্ষের একটি শক্তি এখানে ঘাপটি মেরে ছিল—আমরা প্রাথমিকভাবে তাই সন্দেহ করছি। তদন্ত হবে এবং আইনিভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী মুখাবয়বের মোটিফটিকেই টার্গেট করে আগুন দেয়া হয়েছে। এটি পুরোপুরি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পাশে থাকা ‘শান্তির প্রতীক’ পায়রাটি আংশিকভাবে পুড়েছে। তবে মাছের মোটিফে ফয়েল পেপার থাকায় তা রক্ষা পেয়েছে এবং বাঘের মোটিফটিও অক্ষত রয়েছে। প্যান্ডেলে টানানো তেরপাল পুড়ে গেলেও তা পুনরায় স্থাপনের কাজ চলছে। ডিজাইনাররা ফ্যাসিবাদী মুখাবয়বটি পুনর্নির্মাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সময়মতো এটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
এদিকে মুখে মাস্ক পরে কালো জামা পরিহিত দুর্বৃত্ত দেয়াল টপকে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন লাগানোর সময় আশপাশে কোনো নিরাপত্তারক্ষী, প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্য কিংবা পুলিশ সদস্য ছিলেন না বলে অভিযোগ করেছেন চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, ‘নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার একদিন আগেই রাক্ষুসে স্বৈরাচারের মোটিফটি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ষড়যন্ত্র। আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন দিয়েছে। প্রশাসনের কেউ এর সঙ্গে জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতার কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে।’
আনন্দ শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে গত দুই সপ্তাহ ধরে চারটি মোটিফ তৈরির কাজ চলছিল চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারি সংলগ্ন মাঠে। একটি বড় প্যান্ডেলের নিচে পাশাপাশি এই চারটি মোটিফ নির্মাণ করছিলেন শিল্পীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চারুকলা অনুষদের এক অফিস সহকারী বলেন, ‘সারাদিন কাজ করায় সবাই ক্লান্ত ছিল। তখন ছিল খুব ভোর। অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছিল, কেউ কেউ নামাজে গিয়েছিল। আশপাশে কেউ ছিল না। সেই সুযোগেই দুর্বৃত্তরা আগুন দিয়েছে।’
এদিকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খানকে। অন্যান্য সদস্যরা হলেন—আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক, আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোসাদ্দেক হোসেন কামাল তুষার, বিজ্ঞান অনুষদের সহকারী প্রক্টর ড. এ কে এম নূর আলম সিদ্দিকী এবং চারুকলা অনুষদের সহকারী প্রক্টর মো. ইসরাফিল প্রাং (সদস্যসচিব)।
প্রসঙ্গত, এ বছর বাংলা নববর্ষের আনন্দ শোভাযাত্রার জন্য বাঁশ-বেতের কারুকাজে তৈরি করা হয়েছিল দৈত্যাকৃতির “ফ্যাসিবাদী প্রতিকৃতি”—যার উচ্চতা ছিল প্রায় ২০ ফুট। এতে সাবেক স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখাবয়বের দুপাশে শিংয়ের মতো অবয়ব ছিল। প্রতিকৃতিতে ইতোমধ্যেই প্রলেপের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এটিই ছিল এবারের শোভাযাত্রার প্রধান মোটিফ।










