ক্রমাগত লোকসানে ২০২০ সালের ১ জুলাই খুলনার নয়টিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দেয় সরকার। সে সময় কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া এসব কারখানার ৩৩ হাজারের বেশি শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়। উৎপাদন বন্ধ থাকায় চার বছরের বেশি সময় ধরে এসব কারখানা থেকে আয় হয়নি। উপরন্তু এ সময়ে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২২৪ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাটকলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলেও এখনো বিজেএমসিতে ২ হাজার ৩৪৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে ৮৯৮ জন কর্মকর্তা ও ১ হাজার ৪৪৯ জন কর্মচারী। তাদের মধ্যে খুলনা অঞ্চলের নয়টি পাটকল পরিচালনা ও পাহারার দায়িত্বে রয়েছেন ৯০৩ কর্মকর্তা-কর্মচারী। কাজ না থাকলেও তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দিচ্ছে সরকার। শুধু বেতন বাবদ প্রতি মাসে সরকারের এ খাতে ব্যয় হচ্ছে ৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। রক্ষণাবেক্ষণ ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলে নয়টি পাটকলে প্রতি মাসে ব্যয় ৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। বন্ধ কারখানায় বসিয়ে বসিয়ে বেতন-ভাতা দেয়াকে অযৌক্তিক মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের খালিশপুর শিল্পাঞ্চল আঞ্চলিক শাখার আহ্বায়ক আবু দাউদ দ্বীন মোহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাটকল বন্ধ করে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা হলেও বিজেএমসির কর্মকর্তারা বহালতবিয়তেই রয়েছেন। কোনো কাজ না করেই প্রতি মাসে বেতন পাচ্ছেন। অন্যদিকে কারখানা চালু না থাকায় যন্ত্রপাতিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কারখানাগুলো সরকার অন্য প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিলেও, তারা চালু না করে অন্য ব্যবসা করার পাঁয়তারা করছে।’

পাট সুতা বস্ত্রকল শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান বলেন, ‘পাটকলগুলো বন্ধ থাকায় অসংখ্য শ্রমিক কর্মহীন। কেউ রিকশা-ভ্যান চালিয়ে, কেউ দিনমজুরি করে সংসার চালাচ্ছেন। পাটকল বন্ধ করে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা হলেও বিজেএমসির কর্মকর্তারা বহালতবিয়তেই রয়েছেন।’ পাটকলগুলো আধুনিকায়ন করে আবার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় চালুর দাবি জানান তিনি।

তবে বিজেএমসির খুলনার আঞ্চলিক সমন্বয় কর্মকর্তা মো. গোলাম রব্বানী দাবি করেন, বন্ধ পাটকলগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করছেন। তাই তাদের নিয়মিত বেতন দিচ্ছে সরকার। এখানে অযৌক্তিক কোনো খরচ হচ্ছে না।’

বিজেএমসি সূত্রে জানা যায়, খুলনা অঞ্চলের নয়টি পাটকলের মধ্যে চারটি বেসরকারি খাতে ইজারা দেয়া হয়েছে। এখানকার জমির পরিমাণ ৫১৬ একর। এর মধ্যে ২৮৮ একর ইজারা দেয়া হয়েছে বা ইজারার প্রক্রিয়াধীন। ৩০ সেপ্টেম্বর নতুন করে খুলনার স্টার ও প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলসহ দেশের ছয়টি পাটকল ইজারা দিতে আন্তর্জাতিক আবেদন আহ্বান করে বিজেএমসি।

এদিকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দৌলতপুর জুট মিলটি ফরচুন গ্রুপের কাছে ইজারা দেয়া হয়। ফরচুন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনি ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি কারখানায় স্বল্প পরিসরে উৎপাদন শুরু করেছে। পাশাপাশি তারা জুতা তৈরির কাজও করছে। গত বছরের নভেম্বরে যশোরের রাজঘাট এলাকার জে জে আই জুট মিলের ইজারা পাওয়া আকিজ গ্রুপ উৎপাদন শুরু করেছে। ইস্টার্ন ও কার্পেটিং মিল দুটি ভারতের রিগ্যাল গ্রুপকে ইজারা দেয়া হয়েছে। খালিশপুর জুট মিল ইজারা নিতে শর্তানুযায়ী অগ্রিমের টাকা জমা দিয়েছে রেডিয়েন্ট গ্রুপ। তবে এখনো হস্তান্তর হয়নি। ক্রিসেন্ট জুট মিল ইজারা নিতে ঢাকা শকস নামে একটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছিল। তারা কিছুটা সময়ও চেয়েছে। আলিম জুট মিলের মালিকানা নিয়ে মামলা চলায় কোনো সিদ্ধান্ত নেই।

এ ব্যাপারে পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক কুদরত-ই-খুদা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধসহ পাটশিল্পের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার করে পাটকলগুলো রাষ্ট্রের মালিকানায় চালানো উচিত। পাটকল চালু করলে শিল্পাঞ্চলে আবার কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে। উৎপাদন শুরু হলে পাটের চাহিদাও বাড়বে। এতে ন্যায্য দাম পাবেন পাটচাষীরা।’

পাটকলগুলো লোকসানের কারণ হিসেবে কর্মকর্তাদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও পরিকল্পনার অভাবকে দায়ী করেন কুদরত-ই-খুদা। তিনি বলেন, ‘বন্ধ পাটকল রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। সরকার সেদিকে নজর না দিয়ে আবারো পাটকল ইজারার দরপত্র আহ্বান করছে। এটি সরকারের আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত বলে মনে করছি।’

এ বিষয়ে বিজেএমসির খুলনার আঞ্চলিক সমন্বয়ক কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাটকলগুলো সরকারিভাবে ইজারা দেয়ার যে সিদ্ধান্ত ছিল, তা বহাল রয়েছে। ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর ও স্টার মিল ইজারা দেয়ার প্রক্রিয়া চলমান। তবে কবে নাগাদ এগুলো চালু হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। আলীম জুট মিলের মালিকানা নিয়ে মামলা চলায় এখনো কোনো সিদ্ধান্ত

নেয়া হয়নি।’