প্রবাদ রয়েছে ‘মাঘের শীতে বাঘ পালায়’। তবে প্রকৃতিতে তীব্র শীতল এ মাস আসতে এখনো অন্তত ১৫ দিন বাকি। তার আগেই পৌষের মাঝামাঝি দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কিশোরগঞ্জে; ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময়ে রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র শীতে দেশের সব হাসপাতালে ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্তদের ভিড় বাড়ছে। তাদের বেশির ভাগই ডায়রিয়া আক্রান্ত।

চিকিৎসকরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুরাই শীতকালীন রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জিজনিত জটিলতা শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, আরো দুদিন এমন কুয়াশা থাকতে পারে। এরপর তা কেটে যেতে পারে কিছুটা। তখন শীতের প্রকোপও খানিকটা কমতে পারে।

তীব্র শীত ও হিমেল বাতাসে স্থবির হয়ে পড়েছে কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা নিকলীর জনজীবন। দৈনন্দিন কাজে যেতে না পেরে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। শীতের প্রভাব পড়েছে বোরো ধানের আবাদে। মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় ধানের চারা নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন চাষীরা। হাসপাতালগুলোয়ও বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে এ অঞ্চলের। যদিও রোববার নিকলীর তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

নিকলী প্রথম শ্রেণীর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাহেদুল ইসলাম মাসুদ জানান, গত বছরও শীতে দুদিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় নিকলীতে।

কুয়াশার চাদরে ঢেকে রয়েছে চুয়াডাঙ্গা। সকাল থেকে সূর্যের দেখা মেলেনি। চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণীর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানিয়েছেন, গতকাল জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯১ শতাংশ।

এদিকে শীতে বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। কাজ না পেয়ে অনেকে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কর্মহীন মানুষের খাদ্যাভাব মেটাতে আর্থিক সহায়তার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি বলেও অভিযোগ তাদের। জেলা ও উপজেলা ও পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি থেকে যৎসামান্য কম্বল বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। হাসপাতালগুলোয় বেড়েছে রোগীর সংখ্যা।

প্রচণ্ড শীতে ফেনীর জনজীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া শীতল পরিস্থিতি আগামী কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। গতকাল ফেনীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি মৌসুমে সর্বনিম্ন। আজও পরিস্থিতি একই থাকতে পারে বলে বলে জানিয়েছেন ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান।

শীতে ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে বেড়েছে রোগীর চাপ। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার রোকন উদ দৌলা বলেন, ‘গত কয়েকদিনে ফেনীর হাসপাতালগুলোয় জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্ট রোগীর চাপ বেড়েছে। রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

যশোরে কয়েকদিনের শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টানা দুদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পর পারদ সামান্য ঊর্ধ্বমুখী হলেও শীত কমেনি। বরং গত দুদিন সূর্যের দেখা না মেলায় কুয়াশা আর উত্তরের বাতাসে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি ও শুক্রবার ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দুদিনই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল যশোরে।

আবহাওয়া অফিস জানায়, পৌষের দ্বিতীয় সপ্তাহেই তাপমাত্রা নেমে গেছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। শনিবার জেলার তাপমাত্রা নেমে আসে ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এটি ছিল ওইদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এর আগে শুক্রবারও দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল যশোরে। তবে রোববার তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে ১১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়ায়। গতকাল তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

কুড়িগ্রামে ঘন কুয়াশা কিছুটা কমে এলেও কনকনে শীতের তীব্রতা এখনো কমেনি। গতকাল জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে টানা দুই সপ্তাহ ধরে কুড়িগ্রামে তাপমাত্রা ১১-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছিল। শীতের কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। আগামী কয়েকদিন শীত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার।

উত্তরের হিমেল হাওয়ায় ও ঘন কুয়াশায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী ও ইছামতি নদীর তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা মুন্সিগঞ্জ। গতকাল জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

শীতের তীব্রতা বাড়ায় রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সাইদুর রহমান হিমেল বলেন, ‘অভিভাবকরা সচেতন না হলে নিউমোনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হতে পারে শিশুরা।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পৌষের শুরু থেকেই শীতের তীব্রতা বেড়েছে। কয়েকদিন ধরেই তাপমাত্রা ১১-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। দিনের অধিকাংশ সময় সূর্যের দেখা মিলছে না, ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ। শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে জীবিকার তাগিদে অনেকে কাজের সন্ধানে বের হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শূন্য হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে।