রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় ২০২২-২৩ মৌসুমে জুম আবাদের জমি বাড়লেও আগের মৌসুমের চেয়ে ধান উৎপাদন কমেছে। ২০২১-২২ মৌসুমে ১৬ হাজার ১৬৮ হেক্টর পাহাড়ে জুম আবাদে উৎপাদন হয়েছে ২২ হাজার ৭২৫ টন ধান। ২০২২-২৩ মৌসুমে ১৭ হাজার ৪২২ হেক্টর পাহাড়ে আবাদের বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ২২ হাজার ৫২৪ টন, যা গত মৌসুমের চেয়ে ১৯৯ টন কম। কৃষিবিদরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে মৌসুমের শুরুতে খরা ও অনাবৃষ্টির কারণেই ধান উৎপাদনে ভাটা পড়েছে। তাই আবাদের পরিমাণ বাড়লেও উৎপাদন কমে আসছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় পাহাড়ের পাদদেশে গাছ-গাছালি কেটে আগুনে পুড়িয়ে তৈরি জমিতে বা পাহাড়ে চাষাবাদ করার পদ্ধতিকে জুম চাষ বলা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদ প্রথা জুম। তবে এটি বর্তমানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তায় বড় জোগান দিয়ে আসছে। প্রতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে পাহাড়ের ঢালু স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। এরপর মার্চ-এপ্রিলের দিকে পাহাড়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে অবশিষ্ট আগাছা ধ্বংস করা হয়। এপ্রিল-মে মাসে ঢালু পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে ধানসহ নানা সবজির বীজ বপন করা হয়। যে কারণে জুমচাষকে বহুফসলি চাষাবাদও বলা হয়। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে জুমের ফলন ঘরে তোলে জুমিয়া পরিবারগুলো। তবে দেরিতে আবাদের কারণে অনেকে অক্টোবরেও জুমের ধান তোলেন। পাহাড়ের সমতলে হাইব্রিড, উফশী (উচ্চফলনশীল জাত) ও জুমে স্থানীয় জাতের ধান আবাদ হয়। জুম আবাদ হয় পাহাড়ের ঢালে। তবে আউশ মৌসুমের আবাদি শস্যের বেশির ভাগ উৎপাদনই প্রধানত জুমের ধান থেকে আসে। জুমে স্থানীয় জাত হিসেবে গেলং, কবরক, পাত্তিকী, সোনালি চিকন, বিন্নি, বাশধান, মেরি ধান, সাদা চড়ুই ধান, কনকচাঁপা, রেঙ্গই প্রভৃতি লাগানো হয়। এসব ধানের মূল বৈশিষ্ট্য সুগন্ধি এবং আঠালো। জুমে ধানের পাশাপাশি ‘সাথী সফল’ হিসেবে চাষ হয়—ভুট্টা, শসা, মরিচ, বেগুন, শিম, তিল, ঢেঁড়স, মিষ্টি কুমড়া, ঝিঙে, করলা, আলু, সাবারাঙ (এক ধরনের সুগন্ধিযুক্ত পাতা), কচু, হলুদ প্রভৃতি। অন্যদিকে জুম খেতে আগুন দেয়ার কারণে পাহাড়ের গাছপালা ও কীটপতঙ্গ পুড়ে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জুমচাষ পদ্ধতি নিয়ে পরিবেশবাদীদের রয়েছে আপত্তি। তবে স্থানীয় অধিবাসীদের খাদ্যনিরাপত্তা ও বিকল্প খাদ্য জোগানোর সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় এ চাষাবাদ পদ্ধতি এখনো গুরুত্ববহ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙ্গামাটি অঞ্চলের তথ্যানুযায়ী, ২০২০-২১ মৌসুমে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এ তিন পার্বত্য জেলায় ১৭ হাজার ৭৮০ হেক্টর পাহাড়ে জুম আবাদ হয়েছে, যা থেকে ২৭ হাজার ৯৫৫ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। ২০২১-২২ মৌসুমে আবাদ কিছু কমে ১৬ হাজার ১৬৮ হেক্টরে জুমচাষে ধান উৎপাদন হয়েছে ২২ হাজার ৭২৫ টন। যদিও চলতি ২০২২-২৩ মৌসুমে আবাদের পরিমাণ বেড়ে ১৭ হাজার ৪২২ হেক্টর জমিতে জুম চাষ হয়। গত মৌসুমের চেয়ে ১ হাজার ২৫৪ হেক্টর জমিতে আবাদ বাড়লেও উৎপাদন কমেছে ১৯৯ টন।

অন্যদিকে জুমসহ তিন জেলার আউশের মোট উৎপাদনের হিসাবে দেখা গিয়েছে, ২০২০-২১ মৌসুমে তিন পার্বত্য জেলায় ২৪ হাজার ৪৫৩ হেক্টর সমতল জমি ও পাহাড়ে আউশ আবাদের বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৪৭ হাজার ৮৫৫ টন। ২০২১-২২ মৌসুমে ২২ হাজার ৮০৮ হেক্টরে আবাদের বিপরীতে উৎপাদিত হয়েছে ৪৪ হাজার ১০ টন। সর্বশেষ চলতি মৌসুমে ২৪ হাজার ৪১৯ হেক্টরে আবাদের বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৪৩ হাজার ২৮১ টন। ডিএইর হিসাবেই তিন পার্বত্য জেলায় ক্রমেই আউশ মৌসুমে ধান উৎপাদন কমে এসেছে। আউশ মৌসুমে হাইব্রিড ও উফশী জাতের ধান উৎপাদন না কমলেও মূলত জুমের ধানে উৎপাদন কমেছে দুই বছরের মাথায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টন। আউশ ও বোরো ধান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের খাদ্যশস্যের জোগান হয়। আউশ মৌসুমে জুমের ধান থেকেই ঘাটতি নিরাপত্তার বড় জোগান আসে। তবে পরিবেশ ও জলাবায়ু পরিবর্তনের কারণে জুমের ফলন নিম্নমুখী।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড়ি তিন জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয় বান্দরবানে। বান্দরবানের থানচি, রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলায় উল্লেখজনকভাবে জুমচাষ হয়। জুম চাষে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাঙ্গামাটি। কমবেশি এ জেলার প্রায় সব উপজেলায় আবাদ হলেও বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকল ও জুরাছড়িতে বেশি হয়। খাগড়াছড়িতে সবচেয়ে জুম আবাদ কম হয়। জুম খেতে সাধারণত স্থানীয়জাতগুলোর ধান আবাদ করা হয়। যার মধ্যে বিন্নি, কবরক, গেলং, পাত্তিকী, বাশধান (সুগন্ধি) ও মেরি ধানজাত অন্যতম। জুমের এসব ধানের চাল আঠালো, কালো-লাল রঙের ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের হয়। তবে জুমে ধান উৎপাদন বাড়াতে উফশী জাতের বারিধান ৪৮ ও ৮৩ এবং বিনাধান ১৯ আবাদের পরিকল্পনা রয়েছে কৃষিবিদদের।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বান্দরবানের উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে এপ্রিল-মে মাসে জুম লাগানোর পর অনাবৃষ্টির কারণে ফলন ভালো হচ্ছে না। চলতি বছরও জুলাই-আগস্টে অন্যান্য বছরের এক-তৃতীয়াংশ বৃষ্টিপাত হয়নি। অনাবৃষ্টিতে জুমের উৎপাদনে ভাটা পড়ছে। তবে এবার উৎপাদন কমলেও ফসলের গুণগত মান ভালো। আউশের মৌসুমে সমতলের জেলাগুলোর চেয়ে পাহাড়ের আবাদ পদ্ধতি ভিন্ন। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমতল ভূমিতে আউশের উৎপাদনের ধারাবাহিকতা থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনগত সমস্যা কিংবা খরা-অনাবৃষ্টির কারণে জুমে ধান উৎপাদন কমে আসছে।’

ডিএই রাঙ্গামাটি কার্যালয়ের উপপরিচালক তপন কুমার পাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাহাড়ের মানুষের খাদ্যশস্য হিসেবে চালের চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে আউশ ও বোরো আবাদে। আউশ মৌসুমের জুম আবাদ থেকে উৎপাদনের একটি বড় সহায়তা মেলে। চলতি বছরে জুম লাগানোর শুরুতে অনাবৃষ্টির কারণে উৎপাদন কমেছে।’

উন্নয়নকর্মী ললিত চাকমা মনে করেন পাহাড়ের অধিবাসীদের প্রচলিত জুম চাষে পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক সচ্ছলতার তাগিদে অনেকেই জুম চাষের পাশাপাশি অর্থকরী ফসল ও ফলের বাগান গড়তে ঝুঁকে পড়ায় জুম চাষে আগ্রহ ও মনোযোগ কিছুটা কমেছে। এ কারণেও উৎপাদনও কমছে।’