যাত্রার পর থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের শাহজালাল সার কারখানা। ফলে বিগত অর্থবছরেও উৎপাদন ছিল লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে। এর জন্য দফায় দফায় যান্ত্রিক ত্রুটিকে দায়ী করছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যান্ত্রিক ত্রুটি যেন এ কারখানার নিত্যসঙ্গী। গত অর্থবছরে অন্তত ১০ বার যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য ব্যাহত হয়েছিল উৎপাদন।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে শাহজালাল সার কারখানার নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১২ সালে। ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ কারখানার কাজ শেষ হয় ২০১৫ সালে। প্রকল্পে চীনের ঋণ ব্যবহার করা হয় ৩ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা। ফলে চীনের শর্ত অনুযায়ী, চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কমপ্লান্টে কারখানাটি নির্মাণ করে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কারখানাটি বিসিআইসির কাছে হস্তান্তর করে। হস্তান্তরের তিন মাসের মধ্যে বিসিআইসির অধীনে গঠন করা হয় শাহজালাল সার কারখানা কোম্পানি। একই বছরের ১৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিনপিংকে সঙ্গে নিয়ে এর উৎপাদন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। যাত্রার পর থেকে কখনই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি কারখানাটি। বিগত অর্থবছরেও ছিল একই চিত্র। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ লাখ ২০ হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দফায় দফায় বন্ধ থাকে কারখানাটি। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ২ লাখ ৮০ হাজার টন সার উৎপাদন হয় কারখানাটিতে।
শাহজালাল সার কারখানার প্রকৌশল শাখা জানায়, বছরের শুরুতে সার কারখানার অ্যামোনিয়া গ্যাস টারবাইনের এয়ার কমপ্রেসারের কন্ট্রোল সিস্টেম সফটওয়্যারে ত্রুটি দেখা দিলে বন্ধ হয়ে যায় পুরো প্লান্ট। প্লান্টটি চালু করতে বুয়েটসহ দেশের সব নামিদামি সফটওয়্যার কোম্পানির প্রকৌশলীকে খবর দেয়া হয়। কিন্তু দেশীয় কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি আধুনিক ওই সফটওয়্যার স্থাপন করা। যোগাযোগ করা হলে ওই সফটওয়্যারের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইতালির জি ই অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানির প্রকৌশলী ফেঞ্চুগঞ্জ এসে প্রায় ১০ দিনের প্রচেষ্টায় আধুনিক সফটওয়্যার স্থাপন করেন।
সূত্র জানায়, অ্যামোনিয়া প্লান্টে বিদ্যমান সফটওয়্যারটি ছিল ২০০৫ সালের। গত ৭ মে শাহজালাল সার কারখানায় ফের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ওইদিন বেলা ২টার দিকে কারখানার পাওয়ার প্লান্টের অক্সিলারি বয়লারের এফডি সেন ট্রিপ করে। এতে একটি বয়লার বন্ধ হয়ে গেলে স্টিম স্বল্পতায় বন্ধ হয়ে যায় পাওয়ার প্লান্ট। ফলে প্রায় তিনদিন বন্ধ থাকে কারখানার উৎপাদন। ৯ মে রাত ১১টার দিকে ফের চালু হয় শাহজালালে উৎপাদন। কারখানাটি ২০১৫ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদন করার সময়ও যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়েছিল। তখন প্রায় এক মাস বন্ধ ছিল কারখানাটি। এছাড়া উৎপাদন শাখা জানায়, বিগত অর্থবছরের প্রায় তিন মাস বন্ধ ছিল শাহজালাল সার কারখানা। এতে ব্যাহত হয়েছে লক্ষাধিক টন ইউরিয়া সারের উৎপাদন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
এদিকে শাহজালাল সার কারখানায় উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখার তাগিদ দিয়েছেন শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা। গত জুনে তিনি কারখানাটি পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘ওভারহেড কস্টসহ সিস্টেমলস কমাতে পারলে প্রতিষ্ঠানটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে। কারখানা এলাকার প্রতি ইঞ্চি ভূমিকে যথাযথ উপায়ে কাজে লাগাতে হবে। অব্যবহৃত স্থানে ফলদ, বনজ ও সবজি চাষ করতে হবে। পরীক্ষামূলকভাবে চা বাগানসহ মাছ চাষের জন্য লেক খননের পরামর্শ দেন শিল্প সচিব।’
কারখানাটির উৎপাদন বিষয়ে বেশির ভাগ কর্মকর্তাই কথা বলতে চাননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্যিক শাখার দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইউরিয়া সার উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। প্রতিদিন ১ হাজার ৭৬০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন এ কারখানা প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৪৫০ টন করে ইউরিয়া উৎপাদন করতে পারে। এছাড়া উপজাত হিসেবে উৎপাদন হচ্ছে তরল অ্যামোনিয়া।’
শাহজালাল সার কারখানা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জিয়াবুল হোসেন জানান, এ বিষয়ে কথা বলতে তার নিষেধ রয়েছে। একপর্যায়ে বলেন, ‘শুধু এটাই বলা যায় বর্তমানে নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরেও সার কারখানার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে চার লাখ টন। বর্তমানে শাহজালালের দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ গড়ে ১ হাজার ৪০০ টন।’ তবে ওই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।










