গত বছরের মতো আবারো বেনাপোল বন্দরে আগুনে পুড়েছে আমদানি পণ্য ব্লিচিং পাউডারবাহী ভারতীয় পাঁচটি ট্রাক। গতকাল ভোররাতে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ২ ঘণ্টা চেষ্টার পর তা নিয়ন্ত্রণে আনে। এ নিয়ে গত ১২ বছরে বেনাপোল স্থলবন্দরে বড় ধরনের ১২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেই। বার বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হয়ে পথে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, কিন্তু সে কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয় না কখনই।
সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম জানান, শুক্রবার পাঁচটি ব্লিচিং পাউডারবাহী ট্রাকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বন্দরের অব্যবস্থাপনায় বারবার এভাবে অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির শিকার হলেও বন্দরের কোনো দায়ভার নেই। এ নিয়ে গত এক যুগে ১২ বার বেনাপোল বন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অনেক আমদানিকারক পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছে।
বেনাপোল বন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার এ ঘটনা সম্পর্কে বলেন, পাঁচটি ট্রাকে আগুনের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনই বলা সম্ভব না। কী কারণে ভারতীয় ব্লিচিং বোঝাই ট্রাকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্তে উঠে এলে বলা যাবে।
এর আগে ২০২১ সালের ৭ জুন সন্ধ্যা ৭টায় বন্দরের ৩৫ নম্বর পণ্যাগারের সামনে মহাসড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকে অগ্নিকাণ্ডে মালামালসহ একটি ট্রাক সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। বন্দর সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে বন্দরের ১০ নম্বরসহ ১০টি পণ্যাগারে আগুনে পুড়ে ৩০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়; ২০০১ সালে ২৬ নম্বর পণ্যাগারে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ৩০ কোটি টাকার; ২০০৫ সালে ১০ ও ৩৫ নম্বর পণ্যাগারে আগুনের ঘটনায় ক্ষতি হয় ৭০ কোটি টাকা; ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারিতে ৩৫ নম্বর পণ্যাগারে আগুনে ক্ষতি হয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা, একই বছরের ২২ জুন ২৭ নম্বর পণ্যাগারে আগুনে ক্ষতি হয় ১৫০ কোটি; ২০১৬ সালে ২ অক্টোবরে ২৩ নম্বর পণ্যাগারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকা; ২০১৮ সালের ৬ জুন বন্দরের ২৫ নম্বর শেডে আগুন ধরে এক ট্রাক পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভারতীয় ট্রাক টার্মিনালে এ ঘটনায় প্রায় ১০ কোটি টাকার পণ্য পুড়ে যায়। ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট বন্দরের ৩৫ নম্বর শেডে অগ্নিকাণ্ড প্রায় ৫০ কোটি টাকার পণ্য পুড়ে যায় এবং সর্বশেষ গত ৭ জুন বেনাপোল বন্দরের ৩৫ নম্বর পণ্যাগারের সামনে মহাসড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভারতীয় ব্লিচিং পাউডারবাহী ট্রাকে আগুন লেগে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয় ব্যবসায়ীদের। এছাড়া ছোটখাটো আরো পাঁচ-ছয়টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এ সময়ে।
বেনাপোল বন্দরের আমদানি-রফতানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক জানান, বেনাপোল বন্দরে আমদানি পণ্যের ধারণ ক্ষমতা ৪৫ হাজার টন। কিন্তু সেখানে সব সময় আমদানি পণ্য থাকে প্রায় দেড় লাখ টন। বন্দরে জায়গা সংকটে অনেক সময় সাধারণ পণ্যাগারে কেমিক্যাল পণ্য রাখা হয়। এতেই আগুনের ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। আর যখন আগুন ধরে তখন বন্দরের পর্যাপ্ত জনবল ও সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় নেভানোর আগেই সব পুড়ে শেষ হয়ে যায়।
বর্তমানে এখানে আমদানি পণ্য রক্ষণাবেক্ষণে ৪৪টি পণ্যাগার, চারটি ওপেন ইয়ার্ড, একটি রফতানি টার্মিনাল, একটি ভারতীয় ট্রাক টার্মিনাল ও একটি আমদানীকৃত গাড়ির চেসিস রাখার টার্মিনাল রয়েছে। যেখানে ১৬৩ জন আনসার সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মী পিমার ১০৩ জন ও এপিবিএন নামে একটি নিরাপত্তা সংস্থার ২০ সদস্য আমদানি পণ্যের রক্ষণাবেক্ষণে ও নিরাপত্তায় কাজ করছে। তবে এসব চাহিদার তুলনায় অনেকাংশে কম।
স্থানীয় আমদানিকারক ব্যবসায়ী রেজোয়ান আহমদের অভিযোগ, পণ্যাগারে জায়গার অভাবে খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে মূল্যবান আমদানি পণ্য। এতে করে প্রায়ই চুরির ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের আগে বন্দরের পণ্যাগার থেকে চুরি বেড়ে যায়। গত এক যুগে এ নিয়ে ১২ বার বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছে কয়েকশ আমদানিকারক। বিভিন্ন আইনি জটিলতায় টাকা না পেয়ে ব্যবসা বন্ধ হয়েছে অনেকের।
আমদানিকারক চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের মালিক বিলাল চৌধুরী জানান, সাত বছর আগে বেনাপোল বন্দরের পণ্যগুদামে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ড তার ১৫ লাখ টাকার আমদানি পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তিনি ক্ষতিপূরণের আবেদন করলেও আজ পর্যন্ত কোনো টাকা পায়নি। এমনকি বন্দর কর্তৃপক্ষ আগুনের কারণও তাকে জানায়নি। ওই ঘটনার পর থেকে পুঁজি হারিয়ে আর তিনি ব্যবসা করতে পারেননি।
বেনাপোল বন্দরের ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা শাহিনুর রহমান জানান, এত বড় স্থলবন্দরে মাত্র ছয়জন জনবল নিয়ে তাকে কাজ করতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনা ঘটলে আগুন নেভাতে বিলম্ব হয়। বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানালেও এখন পর্যন্ত জনবল নিয়োগ হয়নি।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সহসভাপতি সাজ্জাদুর রহমান সুজা জানান, বেনাপোল বন্দরে বারবার আগুন লাগলেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এসব ঘটনায় ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পায় না। বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাজুক হওয়ার কারণে অনেক ব্যবসায়ী অন্য বন্দরে চলে গেছেন।
বেনাপোল বন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার জানান, বন্দরে ফায়ার সার্ভিস অফিসে প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আগে বন্দরে জায়গা সংকটের কারণে নির্দিষ্ট পণ্যাগারে পণ্য নামানোর ক্ষেত্রে কিছুটা অনিয়ম হতো। তবে এখন নিয়ম মেনেই স্টোর কিপাররা পণ্য নামিয়ে থাকেন। বন্দরে পণ্য চুরি একেবারে নেই বললে চলে।
এ সময় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা যেন ক্ষতিপূরণ পায় তার জন্য চেষ্টা করা হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা। তিনি আরো জানান, নানা প্রতিবন্ধকতায় ক্ষতিপূরণ পাওয়া জটিল হয়ে পড়ে। গতকাল ভারতীয় পাঁচটি ট্রাকে আগুনের ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। তদন্ত শেষে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ক্ষতির পরিমাণ জানানো হবে।










