দেশের ভোগ্যপণ্যের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে ভারতীয় পেঁয়াজের সরবরাহ সীমিত হয়ে আসায় দেশীয় মুড়িকাটা পেঁয়াজের দিকে ঝুঁকছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল দেশীয় মুড়িকাটা পেঁয়াজ পাইকারি পর্যায়ে বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৯০-১০৫ টাকা কেজি দরে। গত বছরের এই সময়ে একই জাতের পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০-৪০ টাকার ঘরে। এ হিসেবে বছরওয়ারি পণ্যটির দাম বেড়েছে ৬০ টাকা।

এদিকে ভারতীয় পেঁয়াজের সংকট থাকায় পাইকারিতে দেশীয় পেঁয়াজের চাহিদা বাড়ায় উত্তরবঙ্গের মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা দাম পাচ্ছেন গত বছরের প্রায় দ্বিগুণ। পাইকারি বাজারে সরবরাহ ঘাটতিতে থাকা ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৬০ টাকায়। তবে দেশীয় পেঁয়াজের দাম তুলনামূলক কম থাকায় এ পেঁয়াজ কিনছেন ব্যবসায়ীরা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতীয় পেঁয়াজ বাজারে না থাকায় দেশীয় পেঁয়াজের দাম বেড়েছে মাঠ পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত। মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা দাম বেশি পেলে তারা সামনের দিকে পণ্যটি আবাদে আরো বেশি আগ্রহী হবেন। যার প্রভাব পড়বে দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদনে। 

খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীদের দেয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গতকাল পাইকারি বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজের সরবরাহ তেমন ছিল না। আড়ৎগুলোয় থাকা সীমিত পরিসরে এসব ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে চড়া দামে। গত বুধবার সর্বশেষ খাতুনগঞ্জে তিন-চারটি গাড়িতে (১৩-১৫ টন) ভারতীয় পেঁয়াজ এসেছিল। তবে বাজারে দেশীয় মুড়িকাটার সরবরাহ বেশি থাকায় দাম ছিল ভারতীয় পেঁয়াজের তুলনায় কম। তবে বছরের ব্যবধানে মুড়িকাটা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে আড়াই গুণ বেশি দামে।

খাতুনগঞ্জের মেসার্স ইরা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বুধবারের পর আর কোনো পেঁয়াজের ট্রাক ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আসেনি। এ কারণে ভারতীয় পেঁয়াজের দাম বেশি। দেশের বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজের সরবরাহ না থাকায় মুড়িকাটা পেঁয়াজের চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে কৃষক গত বছরের তুলনায় দামও বেশি পাচ্ছেন।’

এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজের সংকটের কারণে এখন দেশীয় পেঁয়াজের দামও অনেক বেড়েছে। গত বছরের বিভিন্ন সময়ে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৪০-৫০ টাকা বিক্রি হলেও এখন এ পেঁয়াজ দ্বিগুণের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এ মুড়িকাটা পেঁয়াজ ২৫-৩০ টাকা কেজি দরেও বিক্রি হয়েছিল।’

মুড়িকাটা পেঁয়াজের পাইকারি বাজার হিসেবে প্রসিদ্ধ উত্তরবঙ্গের পাবনার সুজানগর। এখানকার আড়ৎতদাররা জানান, বর্তমানে তিন ধরনের পেঁয়াজ পাইকারি বিক্রি হচ্ছে এ বাজারে। খুবই ভালো মান ও সাইজে বড় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৩ হাজার ৭০০ টাকা। মাঝারি মানের পেঁয়াজ ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫৫০ টাকা এবং গড়পড়তা সাইজ ও কিছুটা নিম্নমানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। চলতি বছরে পেঁয়াজের চাহিদা বেশি থাকায় দামও বেশি। তবে গত বছরে এ সময়ে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ২ থেকে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে। কিছু পেঁয়াজ ১ থেকে দেড় হাজার টাকায়ও বিক্রি হয়েছিল।

পাবনার সুজানগরের প্রবীণ কৃষক মো. শহীদ সরদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছর আমি ২ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দরে মুড়িকাটা পেঁয়াজ বিক্রি করলেও এ বছর আড়তে বিক্রি করেছি ৩ হাজার ৭০০ টাকা (মনপ্রতি) দরে। মূলত চরাঞ্চল হওয়া ও বেলে মাটির কারণে মুড়িকাটা পেঁয়াজ পাবনায় ভালো উৎপাদন হয়। এভাবে যদি কৃষক প্রতি বছর পেঁয়াজের দাম পায়, তাহলে আগামী বছরগুলোয় আরো বেশি জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হবে।’

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ৩০ লাখ টন। সর্বশেষ রবি মৌসুমে দেশে রেকর্ড ৩৪ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। তবে পচনশীল পণ্য হওয়া ও সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় ভোক্তা পর্যায়ে এক-চতুর্থাংশ পেঁয়াজ নষ্ট ও শুকিয়ে ওজন কমে যায়। ফলে সংকট দেখা যাওয়ায় অনেকটা বাধ্য হয়েই ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে সরকার। এই সুযোগ নিয়ে বারবার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে পেঁয়াজের বাজার।