নব্বইয়ের দশকে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে দেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পের যাত্রা। তবে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের ইতিহাস অনেক পুরোনো। সরকারি তথ্য-উপাত্ত বলছে, প্রাচীনকাল থেকে জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। ১৫০০ থেকে ১৭০০ শতাব্দীতে বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশে সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। উনিশ শতকের প্রথম বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণের সূচনা করে বাংলাদেশ। ২০০৮ সালে শুরু করে আধুনিক জাহাজ রফতানি।

জাহাজ নির্মাণ ও রফতানিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা এখন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। বিগত কয়েক বছরে দেশের শিপইয়ার্ডগুলো ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে ৪০টি জাহাজ রফতানি করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। এ খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আগ্রহী হয়ে উঠছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আমদানিকারকরা, যার সাম্প্রতিক নিদর্শন দেখা গিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) চিঠিতে। সংস্থটির সূত্র বলছে, ইরান ও ভারতের আমদানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে জাহাজ আমদানি করতে চাইছেন।

জানা গিয়েছে, বিশ্বের ২১টি দেশে আছে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উইং। যেখানে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে তৈরি বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বাণিজ্যের আগ্রহ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট দেশের ব্যবসায়ীরা। চলতি বছরের সর্বশেষ প্রান্তিকে বাণিজ্যিক উইংগুলোতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহের বিষয়গুলো সম্প্রতি সংকলন করেছে ইপিবি। সংকলিত তালিকাটি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে জাহাজ আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ইরান ও ভারতের ব্যবসায়ীরা।

সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে নির্মিত জাহাজ আমদানিতে আগ্রহী ইরানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম রেডিসন গ্রুপ। তেহরানে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উইংয়ে এ আগ্রহ প্রকাশ করেছে গ্রুপটি। এছাড়া ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাণিজ্যিক উইংয়ে বাংলাদেশে নির্মিত জাহাজ আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে অ্যাডমনিটাম নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ফেডরিক লেইরম্যানের বরাতে দিল্লিতে বাণিজ্যিক উইংয়ে প্রকাশ করা এ আগ্রহের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে ইপিবি সংকলিত তালিকায়।

জানতে চাইলে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান এএইচএম আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা নিয়মিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উইংগুলোর কার্যক্রম আমরা পর্যবেক্ষণ করি। উইংগুলো থেকে বাংলাদেশের রফতানিকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করবে এমন তথ্য সংগ্রহ করি। এ ধারাবাহিকতায় এক প্রান্তিকের আগ্রহ সংকলন করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের জাহাজ আমদানিতে ইরান ও ভারতের বেসরকারি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া আগ্রহের তালিকায় আরো বেশকিছু পণ্য রয়েছে।

এএইচএম আহসান আরো বলেন, বর্তমানে মোট ১৯টি দেশে আমাদের ২১টি বাণিজ্যিক উইং রয়েছে। এসব উইং থেকে আগ্রহের তথ্য সংগ্রহের পর তা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট রফতানিকারকদের কাছে পৌঁছে দিই। এরপর ব্যবসায়ীরা দ্বিপক্ষীয়ভাবে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে অগ্রসর হন। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে যদি কোনো সহযোগিতা আমাদের কাছে চাওয়া হয়, তাও নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।   

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে নির্মিত জাহাজ ছাড়াও পাটজাত থলে আমদানিতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আবার ভারতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে জাহাজসহ আমদানিতে আগ্রহ থাকা অন্যান্য পণ্য হলো ইস্পাত শিল্পের পণ্য এইচআর কয়েল, তৈরি পোশাক খাতের ডেনিম পণ্য, পাটজাত থলে ও সিরামিকের তৈজসপত্র। এসব পণ্য আমদানিতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বেয়ারলি চেম্বার, ইউনিভার্সেল ট্রেডিং, গ্রোসারি আংকেল ও হেরিটেজ ইন্ডিয়া।

ইপিবির তালিকা অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার চারটি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে আগ্রহী। এসব পণ্যের মধ্যে আছে চামড়া ও পাদুকা, ফার্নিচার, ওষুধ ও জৈব প্রযুক্তি পণ্য। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সাউদার্ন হাইড এক্সপোর্টস, এএফএ অস্ট্রেলিয়া, দ্য থেরাপিউটিক গুডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন।

সুইজারল্যান্ডের ব্রিজ সুইস আগ্রহ প্রকাশ করেছে পাদুকা ও কৃষিপণ্য আমদানিতে। এছাড়া দেশটি বাংলাদেশের তথ্য-প্রযুক্তি সেবা আমদানিতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশে তৈরি স্বাস্থ্য সুরক্ষা পণ্য যেমন, সার্জিক্যাল মাস্ক আমদানির আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের ফ্রেট ইন্টারন্যাশনাল ও প্ল্যাটোস গার্ল লিমিটেডের পক্ষ থেকে আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে বেস বল ক্যাপ ও শিশু পোশাক আমদানির।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবসপ্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ থেকে আমদানিতে আগ্রহী এমন পণ্যগুলোর মধ্যে আছে প্লাস্টিক পণ্য, সফটওয়্যার, সামুদ্রিক খাদ্য, পাটজাত পণ্য ও আম। ফ্রান্সের ব্যবসায়ীরা আগ্রহী বাংলাদেশের কৃষিজাত খাদ্যপণ্য আমদানিতে।

ইপিবির তালিকা অনুযায়ী, কোরিয়ার ব্যবসায়ীদের আগ্রহের তালিকাটি সবচেয়ে বড়। দেশটির ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাংলাদেশের মেডিকেল ব্যান্ডেজ, বায়োস্প্রে, সিম্বায়োটিকের মতো মেডিকেল পণ্যে। এছাড়া আগ্রহ রয়েছে আম, আলু, মাখন ও হালাল মাংস আমদানিতে। এসব পণ্য আমদানিতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো হলো দুক-ইন কো লিমিটেড, অ্যানিমেল অ্যান্ড প্লান্ট কোয়ারেন্টিস এজেন্সি ও গ্লোবাল বিজনেস অ্যালায়েন্স (জিবিএ)।