মানুষ আগুন আবিষ্কার করার পর পৃথিবী আর আগের মতো থাকেনি। আগুন তাকে শীত থেকে বাঁচিয়েছে, অন্ধকার সরিয়েছে, খাবার রান্না করতে শিখিয়েছে। সেই আগুনেই পুড়েছে শহরের পর শহর, মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। বারুদ সাম্রাজ্য বদলে দিয়েছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন মানুষকে দূরত্ব জয় করতে শিখিয়েছে বটে তার সঙ্গে জন্ম দিয়েছে নির্মম শ্রম ব্যবস্থার। পরমাণুর শক্তি আলো জ্বালাতে পারে, আবার মুহূর্তে একটি শহর নিশ্চিহ্নও করতে পারে। ফলে প্রযুক্তির ইতিহাস কেবল সভ্যতার উন্নয়নের নয়, ঝুঁকির ইতিহাসও।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও সভ্যতার ঝুঁকির সে চিরাচরিত দ্বন্দ্বটি সামনে আসছে আরো ভয়ংকর রূপে। বলা যায় ভিন্ন রূপেও। প্রশ্নটি এখন আর কেবল মানুষের তৈরি প্রযুক্তির ক্ষমতা নিয়ে নয়, বরং সেই ক্ষমতার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ অটুট থাকবে কিনা সেটা নিয়েও।
আদিম থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত প্রযুক্তি মানুষের শক্তি বাড়িয়েছে, জীবনযাপন সহজ করেছে। কিন্তু উত্তরাধুনিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চিন্তা, বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত, সৃষ্টি এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকেই অনুকরণ করছে। হরহামেশাই ছাড়িয়ে যাচ্ছে মানুষের সীমাবদ্ধতাকেও। সম্ভবত সভ্যতার ইতিহাসে এ প্রথম মানুষ এমন একটি যন্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে, যেটি কিনা মানুষের মতো বা মানুষের চেয়ে ভালো ভাবতে পারে।
আর ঠিক এখানেই মানব সভ্যতার জন্য হুমকির আশঙ্কা। এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে।
এআই গবেষণায় এখন সবচেয়ে আলোচিত ধারণাগুলোর একটি হলো ‘রিকারসিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ বা নিজের সক্ষমতা নিজেই বাড়ানোর প্রক্রিয়া। সহজভাবে বললে, কোনো এআই যদি আরো উন্নত এআই তৈরি করতে পারে, তাহলে প্রতিটি নতুন উন্নতি পরের উন্নয়নকে আরো সহজ ও দ্রুত করে তুলবে। বর্তমানে নতুন এআই মডেল তৈরি ও উন্নত করার কাজে এরই মধ্যে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সফটওয়্যার তৈরির দীর্ঘ ও জটিল কাজ একটানা নির্ভরযোগ্যভাবে করার সক্ষমতাও দ্রুত বাড়ছে।
এখানেই উদ্বেগের মূল জায়গা। আজ মানুষ একটি উন্নত মডেল তৈরি করছে, সেটি যদি পরবর্তী মডেলের কোড লেখা, ত্রুটি খোঁজা, পরীক্ষা চালানো ও নতুন সমাধান বের করার বড় অংশ করতে পারে, তাহলে প্রতিটি নতুন প্রজন্ম আগের চেয়ে দ্রুত পরের প্রজন্ম তৈরি করতে পারবে। একপর্যায়ে উন্নতির এ চক্র এত দ্রুত হতে পারে যে মানুষ বুঝে ওঠার আগেই এআইয়ের সক্ষমতা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এ কারণেই গবেষকদের আশঙ্কা এআইয়ের ক্ষমতা বাড়ানোর গতি যদি তাকে বোঝা, পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করার মানুষের সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত হয়, তাহলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিজেই একসময় নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
এ জায়গাটিতেই প্রশ্নটি কেবল প্রযুক্তির থাকে না; সভ্যতার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। মানুষের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ভয় শুনলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক এ কি তবে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী? কোনো যন্ত্র একদিন ঘুম থেকে উঠে মানুষকে ঘৃণা করতে শুরু করবে? সমস্যাটিকে বলা হয় ‘এলাইনমেন্ট প্রবলেম’। সহজ ভাষায়, কোনো অত্যন্ত শক্তিশালী যন্ত্রকে আমরা যে লক্ষ্য দেব, সেটি যদি মানুষের প্রকৃত উদ্দেশ্য ঠিকভাবে না বোঝে বা এমন পথে লক্ষ্য পূরণ করে যা আমরা কল্পনাও করিনি, তখন কী হবে?
এর ব্যাখ্যায় দার্শনিক নিক বোস্ট্রমের ‘পেপারক্লিপ ম্যাক্সিমাইজার’ উদাহরণটি বারবার আলোচনায় আসে। কল্পনা করুন, একটি অত্যন্ত সক্ষম যন্ত্রকে বলা হলো যত বেশি সম্ভব পেপারক্লিপ তৈরি করতে। লক্ষ্যটি আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ। কিন্তু যদি সেই লক্ষ্যই তার একমাত্র চূড়ান্ত নির্দেশনা হয়, তবে পর্যাপ্ত শক্তিশালী একটি ব্যবস্থা পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান সম্পদ পেপারক্লিপ উৎপাদনে ব্যবহার করতে চাইতে পারে। এমনকি মানুষ তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও। এখানে যন্ত্রটির মানুষের প্রতি কোনো ঘৃণা নেই। তার কোনো প্রতিশোধস্পৃহাও নেই। সমস্যাটি আরো অস্বস্তিকর—তাকে আসলে আমাদের ঘৃণা করার প্রয়োজনই নেই। মানব সভ্যতার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে কোনো বুদ্ধিমত্তাকে ‘দুষ্ট’ হতে হয় না; যথেষ্ট শক্তিশালী এবং ভুলভাবে নির্দেশিত হওয়াই যথেষ্ট হতে পারে।
এর সঙ্গে আরেকটি আশঙ্কাও আছে। কোনো এআইকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য দেয়া হলে সে সেই লক্ষ্য পূরণে বেশি তথ্য, বেশি কম্পিউটিং শক্তি এবং বেশি সম্পদ ব্যবহার করতে চাইতে পারে। একই কারণে নিজের কাজ চালিয়ে যেতে বাধা এড়ানোর চেষ্টা করাও তার জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে। বাইরে থেকে দেখলে এটাকে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা মনে হতে পারে। কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আবেগ বা ক্ষমতার লোভ নয়; বরং তাকে দেয়া কাজটি শেষ করার সবচেয়ে কার্যকর গাণিতিক পথ বেছে নেয়া।
আজ পর্যন্ত এমন কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি যেখানে একটি এআই সচেতনভাবে মানবজাতিকে ক্ষতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থার নানা অস্বাভাবিক আচরণ ও নিরাপত্তা পরীক্ষায় নিয়ম ভাঙার ঘটনা গবেষকদের উদ্বিগ্ন করেছে, কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি মানব বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত টানা বৈজ্ঞানিক সতর্কতা হবে না।
তবু উদ্বেগটিকে হেসে উড়িয়ে দেয়াও কঠিন। কারণ সতর্কতার ভাষা এখন বাইরের সমালোচকদের কাছ থেকে নয়, প্রযুক্তির ভেতরে কাজ করা মানুষদের কাছ থেকেও আসছে। অ্যানথ্রোপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন এআইয়ের সম্ভাব্য চরম ঝুঁকির কথা বলেছেন। একই প্রতিষ্ঠানের এআই নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যবিষয়ক গবেষণার প্রধান ইভান হুবিঙ্গার আগামী দশকে এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকিকে ১০ শতাংশের বেশি বলে নিজের মূল্যায়ন দিয়েছেন। এটি কোনো প্রমাণিত সম্ভাব্যতার হিসাব নয়; একজন গবেষকের মূল্যায়ন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সম্ভাব্য ক্ষতি যদি পুরো মানব সভ্যতা হয়, তাহলে ১০ শতাংশ দূরে থাক, ১ শতাংশ ঝুঁকিও কি উপেক্ষা করার মতো?
গুগল ডিপমাইন্ডের সাবেক গবেষক বিলাল চুঘতাইও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। আরো তাৎপর্যপূর্ণ হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রতিযোগিতায় থাকা শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারাও এখন উন্নত এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি ও এর নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানাচ্ছেন। যারা গাড়িটির ইঞ্জিন সবচেয়ে ভালো বোঝেন, তারাই যখন ব্রেকের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তখন যাত্রীদের অন্তত প্রশ্ন করা উচিত আমরা কোথায় যাচ্ছি?
কিন্তু সমস্যাটি হলো, ব্রেক চাপার ক্ষমতা কারো একার হাতে নেই। একটি কোম্পানি উন্নয়ন ধীর করলে অন্যটি এগিয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র থামলে চীন এগোবে। চীন থামলে অন্য কেউ এগোতে পারে। প্রযুক্তি এখানে বাজারের প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ফলে সবাই নিরাপদ এআই চাইলেও কেউ প্রথমে ধীর হতে রাজি নয়। অর্থনীতিতে এমন এক পরিস্থিতি আছে, যেখানে সবাই জানে একসঙ্গে সংযত থাকা সবার জন্য ভালো, কিন্তু প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয় থেকে কেউই আগে থামতে চায় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড় এখন অনেকটাই সেই বৈশ্বিক ফাঁদে পড়ে গেছে।
প্রশ্ন আছে আরো। এআই কোনো মানুষের চাকরি নিয়ে নিলে উৎপাদনশীলতার বাড়তি সম্পদ কার হাতে যাবে? কয়েকটি কোম্পানি, না গোটা সমাজের? কোনো অ্যালগরিদম চাকরি, ঋণ, চিকিৎসা কিংবা নিরাপত্তার সিদ্ধান্তে পক্ষপাত দেখালে দায় নেবে কে? লেখক, শিল্পী ও সাংবাদিকের বিপুল কাজ ব্যবহার করে তৈরি একটি মডেলের সৃষ্ট মূল্য কতটা তাদের? স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র যদি একদিন মানুষ হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে, সেই নৈতিক সীমারেখা কোথায় টানা হবে? আর সবকিছুর ওপরে আছে আরেকটি প্রশ্ন, কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কি এমন প্রযুক্তিগত ঝুঁকি নেয়ার নৈতিক অধিকার আছে, যার সম্ভাব্য পরিণতি পুরো মানব সভ্যতাকে ভোগ করতে হবে?
এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর এখনো নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, এআই নিয়ে উদ্বেগ শুধু ভবিষ্যতের কল্পিত বা সম্ভাব্য বিপর্যয়কে ঘিরে নয়। মানুষ জানে কোথায় তার সীমারেখা, এটিই তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। কিন্তু যন্ত্রের সীমারেখা টানার ক্ষমতা কি স্পষ্ট? কিংবা যন্ত্র নিজে সেই সীমা মানবে কি? এর উত্তর হয়তো আজও নিশ্চিতভাবে ‘হ্যাঁ’ নয়। কিন্তু যদি উত্তর হয় ‘হতে পারে’, তাহলেও সেটি মানব সভ্যতার জন্য উপেক্ষা করার মতো আশঙ্কা নয়।

মাহফুজ রাহমান: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, বণিক বার্তা





