নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশন চলছে। অধিবেশনটি চলাকালে মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যের অগ্রগতি বিষয়ক বৈশ্বিক আলোচনায় নেতৃত্বে থাকবে বাংলাদেশ। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ ও সুইডেন যৌথভাবে ‘অঙ্গীকার থেকে কার্যক্রমে: প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতক মৃত্যু অবসানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারির অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক একটি উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা সভা আয়োজন করবে। অনুষ্ঠানটি জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) অংশীদারত্বে আয়োজন করা হবে।
উচ্চ পর্যায়ের এ অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রে রাখার গুরুত্ব তুলে ধরা হবে। এর মাধ্যমে মানসম্মত মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা জনগোষ্ঠীর আরো কাছাকাছি নিয়ে আসা, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব উৎসাহিত করা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন এবং আরো শক্তিশালী, অধিকতর ন্যায়সংগত ও জনকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরবেন। পেশাদার মিডওয়াইফারি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও সুইডেনের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের প্রতিফলন হিসেবে সুইডেন সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্বোধনী বক্তব্য দেয়া হবে। এটি সরকারের ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার বৃহত্তর রূপকল্পেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ রূপান্তরের কেন্দ্রীয় একটি উপাদান হলো চিকিৎসাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে পর্যায়ক্রমে প্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ। কমিউনিটি পর্যায়ের সেবা শক্তিশালী করা, সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিনিয়োগ করা, সুস্থ গর্ভাবস্থা ও নিরাপদ প্রসবকে উৎসাহিত করা এবং এড়ানো সম্ভব এমন মাতৃ ও নবজাতক মৃত্যু প্রতিরোধ—এ দৃষ্টিভঙ্গির অপরিহার্য উপাদান।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ পদ সৃষ্টি করার একটি বড় নীতিগত অঙ্গীকার করেছে। এ বিনিয়োগ শুধু মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করবে না, বরং নারী ও তরুণদের জন্য পেশাগত সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আরো অভিঘাতসহনশীল সম্মুখসারির স্বাস্থ্য জনবল গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে।
উচ্চ পর্যায়ের এ অনুষ্ঠানে এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোর স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিদের পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার নেতৃত্ব, উন্নয়ন সহযোগী, জনহিতৈষী সংস্থা, নাগরিক সমাজ এবং বেসরকারি খাতের নেতারা অংশ নেবেন। মেক্সিকো, নেপাল, সিয়েরা লিওন, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীরা মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
একটি উপস্থাপনা ও উচ্চ পর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় দেশগুলো কীভাবে রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে পেশাদার মিডওয়াইফারি এবং সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য টেকসই বিনিয়োগে রূপান্তর করতে পারে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হবে। এ প্যানেল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী হিসেবে আমার নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া আলোচনায় সরকারগুলো কীভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পেশাদার মিডওয়াইফদের অর্থায়ন, পদায়ন এবং ধরে রাখতে পারে, তা পর্যালোচনা করা হবে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু নিজের স্বাস্থ্য খাতের রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে চায় না, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কীভাবে সংগঠিত ও অর্থায়িত হয়, তা নতুনভাবে ভাবার একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক আন্দোলনেও অবদান রাখতে চায়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের বার্তা স্পষ্ট—মানুষকে সুস্থ রাখতে, এড়ানো সম্ভব এমন অসুস্থতা ও মৃত্যু প্রতিরোধ করতে এবং মানুষ যেখানে বসবাস করে তার কাছাকাছি মানসম্মত সেবা পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আরো বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।
এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মিডওয়াইফারিতে বিনিয়োগের জন্য নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে থাকবে আরো শক্তিশালী নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো, মানসম্মত শিক্ষা, পেশাদার মিডওয়াইফদের পদায়ন ও ধরে রাখা এবং জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে মিডওয়াইফদের জন্য আরো বেশি নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি।
জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক সংলাপের কেন্দ্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার মধ্যে মিডওয়াইফারিকে স্থান দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ দেখাতে চায় যে মা ও নবজাতকদের সুরক্ষা শুধু একটি বিশেষায়িত স্বাস্থ্য কৌশল নয়; এটি একটি ন্যায়সংগত, অভিঘাতসহনশীল ও প্রতিরোধমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার মৌলিক বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এ রূপান্তরের একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক প্রবক্তা হয়ে উঠতে চায়। এর লক্ষ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চিকিৎসা থেকে প্রতিরোধে, হাসপাতালকেন্দ্রিক সেবা থেকে আরো শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় এবং শেষ পর্যন্ত সবার জন্য উচ্চ মানের স্বাস্থ্যসেবার দিকে এগিয়ে নেয়া।
এ বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা দেশে ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ রূপকল্পকে বাস্তব সংস্কারে রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি আরো সুস্থ মা, আরো সুস্থ শিশু ও আরো সুস্থ সমাজ গড়ার বৈশ্বিক আন্দোলনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বকে অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি করছে।
ড. এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার: প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী





