‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার দেশের এভিয়েশন খাতকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরে কাজ শুরু করেছে। আমাদের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা। এ অগ্রযাত্রায় এভিয়েশন খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এয়ারপোর্ট হলো কোনো দেশের আয়না। আমরা এয়ারপোর্টকে যে অবস্থায় পেয়েছি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আলোচকদের অনেকেই এয়ারপোর্ট ও বাংলাদেশ বিমানের নানা সংকট নিয়ে কথা বলেছেন। তাদের কথায় উঠে এসেছে কেন বিদেশীরা আমাদের এখানে আসতে আগ্রহী হয় না। বাংলাদেশে বিদেশীরা কেন আসবে, তারা কী দেখবে। আমরা পর্যটন নিয়ে চিন্তা করিনি। আমাদের নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন আছে। আকর্ষণ করার মতো কি নেই আমাদের! আমরা সেসব পর্যটন আকর্ষণগুলোকে ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা করতে পারিনি। এর দায় বিগত পতিত সরকারের। ফ্যাসিবাদী ওই সরকার সেজন্য তেমন কাজ করেনি। তারা আসলে বাংলাদেশকে ভালোবাসত না। কিন্তু আমরা বলতে পারি আমরা বাংলাদেশকে ভালোবাসি এবং বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের সবাই বাংলাদেশের জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিদ্যমান সংকটগুলো দূর করতে আমাদের সুযোগ দিতে হবে, সময় দিতে, সহযোগিতা করতে হবে।
আমাদের একটি এভিয়েশন হাব করতে হবে এবং সেজন্য কী করণীয় এগুলো আমাদের সবার মাথায় রয়েছে। এভিয়েশন হাব করতে হলে আমাদের সুন্দর এয়ারপোর্ট লাগবে, কার্গো ও যাত্রী সুবিধা আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে কী ধরনের এয়ারপোর্ট আছে এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো কীভাবে পরিচালিত হয় তা নিয়ে আপনাদের সবার অভিজ্ঞতা আছে। দীর্ঘ ৪২ বছর পর আমরা বেসামরিক বিমান পরিবহনের নিয়মকানুন পরিবর্তন করতে যাচ্ছি। যে নিয়মগুলো অংশীদারদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা আমরা দূর করছি। কারণ আমরা অংশীদারদের সুযোগ দিতে চাই—এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আপনারা আশাবাদী হতে পারেন। আমরা মাত্র শুরু করলাম, পাঁচ বছর পর আপনারা আশা করি বলতে পারবেন। আমরা অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি—আমাদের গ্যাস সংকট আছে, বিদ্যুৎ সংকট আছে। এভিয়েশন খাতও নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রতিটি সমস্যাকে মোকাবেলা করতে বদ্ধপরিকর। আমরা সবার পরামর্শ, সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ কামনা করছি।
সম্প্রতি আমি এয়ার এশিয়া পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। এয়ার এশিয়া পরিদর্শনে গিয়ে তাদের উড়োজাহাজ ও পরিচালনা পদ্ধতি দেখেছি—কীভাবে তারা ২৫ মিনিটের মধ্যে একটি উড়োজাহাজ প্রস্তুত করে ফেলে, কীভাবে তারা কম খরচে টিকিটের ব্যবস্থা করে। এসব অভিজ্ঞতা আমি গ্রহণ করছি। আমরা বাংলাদেশে এ বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে চাই। আমাদের উড়োজাহাজ নষ্ট হলে ঠিক করতে ভারত অথবা সিঙ্গাপুরে পাঠাতে হয়। তারপর আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নিয়ম মানতে হয়।
অংশীজনদের সহায়তা করতে আমরা সিভিল এভিয়েশন আইনগুলো সংশোধনের দিকে এগোচ্ছি। বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী হিসেবে আমি তা করব। এয়ারলাইনসে বিনিয়োগ সহজীকরণের লক্ষ্যে বিধিমালা তৈরিতে অংশীজনদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছি, ধাপে ধাপে সব সংকট দূর করতে কাজ করব। আপনাদের সঙ্গে এরই মধ্যে বসা শুরু করেছি, আশা করি সামনের দিনগুলোয় আরো অনেকবার বসা হবে। আপনাদের পরামর্শ ও সাজেশন আমলে নিয়ে সংকট সমাধানে কাজ এগিয়ে নেব। বাংলাদেশ বিমানের জটিল যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জটিলতা নিরসনে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
আমরা ক্ষমতায় এসে একটি ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল এভিয়েশন খাত পেয়েছি। চারদিকে যাত্রী হয়রানির অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। আমাদের সরকারের অন্যতম লক্ষ্য এ হয়রানি লাঘব করা। কনভেয়ার বেল্টে ছেঁড়া লাগেজ পাওয়া যেত, লাগেজ আসতে সময় লাগত দেড় থেকে ২ ঘণ্টা। সেগুলো কিন্তু এ কিছুদিনেই অনেক সমাধান হয়েছে। আমরা কর্মীদের শরীরে ক্যামেরা (বডি ক্যামেরা) যুক্ত করেছি। তিন-চারদিন আগে আমি নিজে পরিদর্শন করে নির্দেশনা দিয়েছি—যখন যাত্রীদের দরজা খুলবে, কার্গোর দরজাও একসঙ্গে খুলতে হবে। একদিকে যাত্রী নামবে, অন্যদিকে কার্গো নামবে, যাতে ১৮-৪০ মিনিটের মধ্যে সব লাগেজ বেল্টে চলে আসে। এরপর খবর নিলাম—এখন বেল্ট থেকে লাগেজ নিতে ৪০ মিনিটের বেশি সময় লাগে না।
আমরা এমন কিছু কাজ নতুন করে শুরু করেছি, যা আগের সরকার বাতিল করেছিল। তাদের সে বাতিলের সিদ্ধান্তে আমাদের প্রায় ২১০ কোটি ডলার ক্ষতি হতো। জাপানি কনসোর্টিয়ামকে বাতিল করার সিদ্ধান্তটি ছিল সত্যিই ধাক্কা দেয়ার মতো একটা সংবাদ। এ ২১০ কোটি ডলার কেন আমরা নষ্ট করব? আগের রাজনীতিবিদদের মাথায় এটি ছিল না। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করে তা পুনর্বহাল করেছেন।
আমাদের এটা নেই, ওটা নেই, রানওয়ে নেই, কেন প্লেন কিনছেন, টাকার অপচয়!—এ কথাগুলোর মধ্যে কিন্তু সত্যতা আছে। কিন্তু আমরা সেগুলো ঠিক করব। আমাদের ইতিবাচকভাবে ভাবতে হবে। সবকিছুই করা সম্ভব। এখন এ বিমানবন্দর থেকে আমরা ১২ মিলিয়ন যাত্রী যাতায়াত করাতে পারি। থার্ড টার্মিনাল যখন পুরোপুরি চালু হতে যাচ্ছে, তখন ২৪ মিলিয়ন বা তারও বেশি যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে। আমার আশা এটি আরো বেড়ে ৩০ মিলিয়ন হবে, ফলে আন্তর্জাতিক এয়ারক্রাফট বাংলাদেশে আরো বেশি আসবে। আমরা বিমানের সংখ্যা আরো বাড়াব। বাজেট এয়ারলাইনস নিয়ে আমরা এরই মধ্যে আলোচনা করেছি। এমনকি এভিয়েশন খাতের স্বনামধন্য ব্যক্তি মিস্টার টনি ফার্নান্দেজের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আগামী নভেম্বরে আসছেন। তিনি এখানেই এমআরও স্থাপন করবেন, বাজেট এয়ারলাইনস চালু করবেন। প্রয়োজন হলে—যদি এ এয়ারপোর্ট বর্ধিত চাহিদা পূরণ করতে না পারে তাহলে আমরা একটি নতুন এয়ারপোর্টের কথা চিন্তা করব।
পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করার জন্য আমরা এরই মধ্যে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। পিপিপি মডেল, যৌথ উদ্যোগ মডেল এবং যেগুলো আমরা চালাতে পারছি না, সেগুলো বেসরকারি খাতকে দিয়ে সচল করা হবে।
আমরা অনেক উদ্যোগ হাতে নিয়েছি, তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময়ের প্রয়োজন। আপনারা অন্য দেশের উদাহরণ দেখতে পারেন, যেখানে অল্প কয়েকটি প্লেন থেকে শুরু করে আজ বিশাল বহর হয়েছে। কারণ সেখানে এভিয়েশন খাত নিয়ে অহেতুক টানাটানি করা হয়নি। আমাদের এখানে সংশয়-সন্দেহের প্রবণতা বেশি। আমি ধন্যবাদ জানাই ইউএস-বাংলাকে, তারা ২১টি বোয়িং লিজ নিচ্ছে। সামনে হয়তো আরো আনবে। অন্যরাও এগিয়ে আশবে আশা রাখি। আমাদের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিক উড়োজাহাজ সংস্থাকেও শক্তিশালী করতে চাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী চান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাত একটি উচ্চতর মাত্রায় উঠুক। আমরা এ অগ্রযাত্রায় সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।
এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত: মন্ত্রী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে]





