বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি অনন্য দেশ যেখানে বিভিন্ন খেলার অসংখ্য সমর্থক থাকা সত্ত্বেও সেসব খেলায় দেশের অবস্থান পেছনের সারিতে। গত কয়েক দশকে ক্রিকেট দাঁড়ালেও এশিয়া কাপ বা বিশ্বকাপের কোনো ট্রফি ছোঁয়া হয়নি। মাসখানেক আগে আয়োজিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে সমর্থকদের উন্মাদনায় বাংলাদেশ ওপরের সারিতেই ছিল। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম। একটি জাতিকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ, সবল ও কর্মঠ করতে খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে জাতীয় ব্র্যান্ডিং, পর্যটন চাঙ্গা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান রাখে। দেশের স্বার্থেই ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিদ্যমান অবকাঠামো ও নীতিগত সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে।
ক্রীড়াবিদদের নিয়ে জাতীয় আবেগ কম নয়। কিন্তু ক্রীড়া নিয়ে এ বিপুল আগ্রহের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক ক্রীড়া সক্ষমতার কোনো সামঞ্জস্য নেই। বরং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক র্যাংকিং বলছে, বাংলাদেশের ক্রীড়া ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস র্যাংকিংসে ২০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম। এক বছর আগেও যেখানে অবস্থান ছিল ১২৭তম, সেখানে মাত্র এক বছরে ৪৮ ধাপ নিচে নেমে যাওয়া নিছক পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটেরই প্রতিফলন।
এর উত্তর খুঁজতে হলে সবার আগে নজর দিতে হবে খেলোয়াড় তৈরির পুরো প্রক্রিয়ার দিকে। একজন প্রতিভাবান শিশু বা কিশোরকে খুঁজে বের করা থেকে শুরু করে তাকে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে তোলা পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রয়োজন। গ্রাসরুট পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণ, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, পুষ্টি, চিকিৎসা, ক্রীড়া বিজ্ঞান, কোচিং ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা—প্রতিটি ধাপ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশে এ চেইনটি দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন।
বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) হওয়ার কথা ছিল এ খেলোয়াড় তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু সেখান থেকেও নিয়মিতভাবে বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ তৈরি হচ্ছে না। একটি দেশের ক্রীড়া উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যদি কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে না পারে, তাহলে সামগ্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা সহজেই অনুমান করা যায়। শুধু বিকেএসপি নয়, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন, জেলা-উপজেলা পর্যায়ের ক্রীড়া অবকাঠামো এবং বেসরকারি একাডেমিগুলোর মধ্যে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি।
বাংলাদেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রের আরেকটি বড় সমস্যা ক্রিকেটকেন্দ্রিকতা। ক্রিকেট জনপ্রিয়, এতে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে এবং দর্শক ও পৃষ্ঠপোষকতার বড় অংশও এ খেলার সঙ্গে যুক্ত। ফলে ক্রিকেটকে ঘিরে একটি শক্তিশালী ক্রীড়া অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল অন্য খেলায় সেভাবে পৌঁছেনি। অ্যাথলেটিকস, শুটিং, আর্চারি, সাঁতার, জিমন্যাস্টিকস, ভারোত্তোলন, দাবা কিংবা হকির মতো খেলাগুলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার অভাবে পিছিয়ে পড়েছে।
ক্রিকেট বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলেও এখনো কোনো বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি দেশের ঘরে আসেনি। অন্যদিকে অলিম্পিকের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে ১৯৮৪ সাল থেকে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেও বাংলাদেশ কোনো পদক অর্জন করতে পারেনি। ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে গলফার সিদ্দিকুর রহমান সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন; কিন্তু সামগ্রিকভাবে অলিম্পিকের মঞ্চে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো মূলত বিশেষ কোটা বা ওয়াইল্ড কার্ডনির্ভর।
এ অবস্থার বিপরীতে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সাম্প্রতিক সাফল্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। নারী দল ২০২২ ও ২০২৪ সালে টানা দুবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে এবং ২০২৬ সালে প্রথমবার এএফসি এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। অথচ তাদের সুযোগ-সুবিধা ক্রিকেটারদের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত।
দাবার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার চিত্রটি তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০৮ সালে এনামুল হোসেন রাজীবের পর ১৮ বছর ধরে দেশ নতুন কোনো গ্র্যান্ডমাস্টার পায়নি। একই সময়ে ভারতে গ্র্যান্ডমাস্টারের সংখ্যা ১৮ থেকে বেড়ে ৮৯ হয়েছে। একসময় জেলা, উপজেলা, বিভাগ ও স্কুল পর্যায়ে নিয়মিত বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের মধ্য দিয়ে খেলোয়াড় উঠে আসত। গত দুই দশকে সেই পাইপলাইন সংকুচিত হয়েছে। কোথাও স্টেডিয়াম অচল, কোথাও অব্যবহৃত, কোথাও আবার মাঠের পরিবর্তে বসেছে হাটবাজার। চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়াম, বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা স্টেডিয়াম কিংবা খুলনা বিভাগীয় স্টেডিয়ামের মতো ভেন্যু দীর্ঘদিন কার্যত অচল পড়ে থাকা কেবল অবকাঠামোগত অপচয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্মের ক্রীড়াবিদ তৈরির সুযোগ হারানো।
কোনো ফেডারেশন ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হলে নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণের পর তা ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে কিনা এবং খেলোয়াড় তৈরিতে তার ভূমিকা কী—এসবেরও নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্বে। গত জুনে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ক্রিয়েটিভ ইকোনমির কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীও নিয়মিত খেলাধুলায় জোর দেয়ার কথা বলছেন এবং তিনি যে অনেক আন্তরিক বেশ কয়েকটি ইভেন্টে অংশ নিয়ে তা প্রমাণ করেছেন। আশা করি, খেলাধুলায় বাংলাদেশের বেহাল দশা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সরকার ধাপে ধাপে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের ১৭৫তম অবস্থান তাই কেবল একটি র্যাংকিংয়ের সংখ্যা নয়। এটি আমাদের ক্রীড়া ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, লক্ষ্যহীনতা, বিনিয়োগের ঘাটতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার একটি সতর্কবার্তা। ক্রিকেট বা ফুটবল নিয়ে আবেগ থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আবেগকে যদি একটি টেকসই ক্রীড়া সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে রূপান্তর করা না যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক সাফল্য কাকতালীয় কিছু অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।





