বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে খাতটির সম্পৃক্ততা নিয়ে আয়োজিত এ কনক্লেভে (বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন) এভিয়েশনের কোনো কারিগরি বিষয়ে বক্তৃতা বা উপস্থাপনা দিতে আসিনি। বরং সরকারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং এ খাতের ওপর সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরতে চাই—সরকার এ খাতকে কীভাবে দেখছে এবং কীভাবে এখানে প্রবৃদ্ধি ঘটাতে চায়।
এভিয়েশন খাত নিয়ে আমাদের অবশ্যই অনুপ্রাণিত হতে হবে। যদিও এ কনক্লেভে উপস্থিত হয়েই এ খাত সম্পর্কিত চমৎকার কিছু উপস্থাপনা দেখেছি এবং এ খাতের কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে, যা থেকে বোঝা যায় বহু মানুষের মধ্যে খাতটি ঘিরে চরম হতাশা জমে আছে। এটি স্বাভাবিক, কারণ যে দেশে গত ১৫-১৬ বছর কোনো গণতন্ত্র ছিল না, সেখানে হতাশা থাকাটাই স্বাভাবিক। ফলে এটাও অস্বাভাবিক নয় যে এভিয়েশন খাতের বিকাশে সহায়ক নীতিনির্ধারণী কাঠামো বা নিয়ন্ত্রক পরিবেশ ছিল না। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে সহায়ক নীতি কৌশলও নেয়া হয়নি। কেননা এক্ষেত্রে আগ্রহও ছিল না। সরকারের একমাত্র আগ্রহ ছিল দেশের এভিয়েশন খাতসহ অন্য খাতগুলোকে লুটপাটের উৎসে পরিণত করা।
কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়েছে। তাই আমরা আশাবাদী হতে চাই। আমি বলছি, যদি পাঁচ বছর পর অর্থাৎ আমাদের (বিএনপি সরকারের) প্রথম মেয়াদ শেষে এভিয়েশন খাতে যদি অতীতের মতোই হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে যায়, তাহলে এ খাতের কাছ থেকে আমাদের তিরস্কার পাওয়া উচিত। তবে আমি আত্মবিশ্বাসী যে আমরা (বিএনপি সরকার) সহায়ক নীতির মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ এভিয়েশন খাত গড়ে তুলব, যা ব্যবসা করার পথ সুগম করবে এবং একই সঙ্গে যাত্রীদের বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেজন্য বিমানবন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। জাতীয় বিমান সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এটিকে আধুনিকায়ন করতে হবে। আমাদের আন্তর্জাতিক মানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাইরের কেউ এসে এটি করে দেবে না। আমরা যখন এটি করব, অন্যরা অংশীদার হবে। কিন্তু কেউ আমাদের হয়ে করে দেবে না। নেতৃত্ব আমাদেরই দিতে হবে।
অতীতে যা হওয়ার হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে আমরা এভিয়েশন খাতের জন্য ইতিবাচক কাজ করতে চাই। আমাদের বিমানবহর সম্প্রসারণ করতে হবে। এটি অন্য কারো দায়িত্ব নয়, এটি আমাদেরই কাজ, কারণ আমরা এ খাতকে বড় করতে চাই। নেটওয়ার্ক ও রুট সম্প্রসারণের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায়, তা কাজে লাগাতে চাই—আর তার জন্য পর্যাপ্ত বিমান থাকতে হবে। আমরা বোয়িং কিনব নাকি এয়ারবাস কিনব, এটি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এতে অন্য কারো কিছু বলার নেই।
আমাদের (ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের) তৃতীয় টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। এটি দেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। সরকার দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিনে আমরা যে পরিস্থিতি পেয়েছিলাম, সেখান থেকে খুব দ্রুতগতিতে তৃতীয় টার্মিনাল-সংক্রান্ত আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিনেই তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে একটি আলোচনা কমিটি গঠন করেছিলেন, যেখানে বিমানমন্ত্রী (বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী) এবং প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে আমি নিজেও ছিলাম। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে যত দ্রুত সম্ভব তৃতীয় টার্মিনাল-সংক্রান্ত আলোচনা শেষ করতে এবং এমন একটি চুক্তি করতে, যা উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক হবে। অর্থাৎ একটি ‘উইন-উইন’ চুক্তি যেন হয়। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই, আমরা এমন একটি চুক্তি সম্পন্ন করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, যা হবে পারস্পরিকভাবে লাভজনক। পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজস্ব আয়েও বড় ভূমিকা রাখবে।
তৃতীয় টার্মিনালটি আগামী ডিসেম্বরে চালু হতে পারে। তবে এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে শুরু হতে পারে। আলোচনায় যে দ্রুততা ও কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে, তার ফলেই এটি সম্ভব হচ্ছে। এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি বড় বিমান চলাচল কেন্দ্রে পরিণত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এছাড়া তৃতীয় টার্মিনাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অপারেশনাল (পরিচালন) প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। বিমানবন্দর থেকে যাত্রীদের স্থানান্তরের ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অপারেশনাল প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে এবং আমরা তা করব। এ বিষয়ে আমরা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করছি, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছি।
আমাদের রুট নেটওয়ার্ক ও ফ্লাইটের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়াতে হবে। কার্গো এবং পরিবহন সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। শুধু যাত্রী পরিবহনের উপযোগী বিমান কেনাই যথেষ্ট নয়; আমাদের কার্গো, ফ্লাইটের ফ্রিকোয়েন্সি এবং অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে। ই-কমার্সের এ যুগে বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
নিজেদের মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল অর্থাৎ এমআরও সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় বিমান চলাচল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের পাইলট তৈরি করতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মের এয়ারলাইনস প্রকৌশলী তৈরি করতে হবে। গ্রাউন্ড স্টাফদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যাতে আমরা এমন একটি বিমান চলাচল খাত গড়ে তুলতে পারি, যা কার্যকর, প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সেবার মানে হবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন।
নীতিগত ও নিয়ন্ত্রণ পরিবেশের ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব আমরা একটি ‘ওপেন স্কাই’ নীতি বজায় রাখব। অবশ্যই মাঝেমধ্যে এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন আমাদের আকাশসীমা বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে, তবে সেটি হবে একেবারে চরম পরিস্থিতিতে। আমাদের প্রয়োজন উন্মুক্ত আকাশসীমা। আমরা দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো হতে চাই। এমন একটি ‘ওপেন স্কাই’ নীতি চাই, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ফ্লাইট দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং তার বাইরের গন্তব্যে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের একটি পূর্ণাঙ্গ বাজারের সম্ভাবনা এখানে রয়েছে। বর্তমানে এ বাজারের মূল্য সম্ভবত প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। আমাদের এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি সমৃদ্ধ আঞ্চলিক রুট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। কম খরচের এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং নতুন গেটওয়ের সম্ভাবনা দেখতে হবে।
পূর্ব এশিয়া, চীন, জাপান, কোরিয়া—এসব যাত্রী পরিবহন, পর্যটন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য বিশাল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। ওই দিকেও মানুষ ও পণ্যের চলাচল বাড়ানোর বিপুল সুযোগ রয়েছে।
আমি বিশ্বাস করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এ দেশ এগিয়ে যাবে, সমৃদ্ধ হবে। ইতিবাচক অর্থে বিশ্বকে চমকে দেবে। বিভিন্ন খাতে ও বিভিন্ন উপায়ে ইতিবাচকভাবে নেতৃত্ব দেবে।
আবার বিমানমন্ত্রীর বিষয়ে বলতে চাই—তার বেসরকারি খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তাকে আটকে রাখতে পারবে না। সরকার হিসেবে আমরাও একসঙ্গে এসব জটিলতা ভেঙে দেশে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করব।
হুমায়ুন কবির: প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে বিশেষ
অতিথির বক্তব্যে]





