বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত জ্বালানি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ব্যবস্থা ও গ্যাসের ঘাটতির বিষয়গুলো সামনে আসে। কিন্তু এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান আমাদের চারপাশেই রয়েছে—যেসব ভবনে আমরা বসবাস করি, কাজ করি, পড়াশোনা করি এবং কেনাকাটা করি। দ্রুত নগরায়ণ, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যবহারের কারণে ভবনের নকশাই নির্ধারণ করতে পারে একটি দেশে কতটা বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। তাই এক্ষেত্রে প্রশ্নটি হলো বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা নয়, বরং কীভাবে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর কারণে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অনেক এলাকায় গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায়ই ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ‘উষ্ণ ও আর্দ্র’ জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বর্তমানে ১৭ কোটিরও বেশি এবং নগর জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বৃহত্তর ঢাকা মহানগর এলাকায়ই দুই কোটির বেশি মানুষ বসবাস করে। নগর ঘনত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শীতলীকরণ, আলোকসজ্জা, লিফট, পানির পাম্প ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির চাহিদাও বাড়বে।
গত দুই দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট থেকে সাম্প্রতিক সময়ে ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হয়েছে। তবে স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা সবসময় নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে না; জ্বালানি সংকট, সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা এবং অতিরিক্ত চাহিদার কারণে প্রকৃত সরবরাহ কমে যেতে পারে। গরমের সময়ে এয়ার কন্ডিশনার, ফ্যান ও রেফ্রিজারেশনের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কয়েক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তাই উন্নত ভবন নকশার মাধ্যমে বিদ্যুতের চাহিদা কমানো গেলে সমপরিমাণ নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়েও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব।
ঢাকার একটি সাধারণ অফিস, অ্যাপার্টমেন্ট বা বাণিজ্যিক ভবনের ভেতরেই সমস্যাটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বড় কাচের জানালা সরাসরি সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, কংক্রিটের ছাদ সারা দিন তাপ শোষণ করে, শব্দ ও বায়ুদূষণের কারণে জানালা বন্ধ রাখা হয় এবং ভবনের ভুল অভিমুখ, অপর্যাপ্ত ছায়া ও দুর্বল বায়ু চলাচলের ঘাটতি পূরণ করতে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করা হয়। একটি ছোট অফিসের এয়ার কন্ডিশনার চালু অবস্থায় প্রায় এক থেকে দুই কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। যদি ১০০টি অফিস প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা একটি এসি ব্যবহার করে, তাহলে আলো, কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাদ দিয়েও দৈনিক মোট বিদ্যুৎ খরচ ৮০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ কিলোওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। হাজার হাজার ভবনে এর সম্মিলিত প্রভাব জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, এ চক্র ভাঙা সম্ভব। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) মনে করে, ভবন খাতে শীতলীকরণজনিত জ্বালানি চাহিদা সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে এবং বর্তমান নীতিগত পরিস্থিতিতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত এটি বছরে প্রায় ৪ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাপী ভবনে ব্যবহৃত মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এরই মধ্যে এয়ার কন্ডিশনার ও বৈদ্যুতিক ফ্যানের পেছনে ব্যয় হয়। আইইএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিশ্বে এয়ার কন্ডিশনারের সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ৫০০ কোটির বেশি হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এ পূর্বাভাস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আয় বৃদ্ধি, উষ্ণতর গ্রীষ্ম এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ শীতলীকরণের চাহিদা বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জলবায়ু-উপযোগী ভবন নকশা। যান্ত্রিক ব্যবস্থা যুক্ত করার আগে একটি ভবনকে তার অবস্থান ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য উষ্ণ ও আর্দ্র শহরে এর অর্থ হলো সরাসরি সৌরতাপ প্রবেশ কমানো, বায়ু চলাচল বাড়ানো এবং অতিবৃষ্টি ও আর্দ্রতা থেকে অভ্যন্তরীণ স্থানকে সুরক্ষিত রাখা। ভবনের সঠিক অভিমুখ নির্ধারণের মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম দিকের তীব্র সূর্যালোকের প্রভাব কমানো যায়। গভীর বারান্দা, আনুভূমিক ছাউনি, বহিরাগত লুভার এবং গাছপালা জানালায় সূর্যের তাপ পৌঁছার আগেই তা প্রতিহত করতে পারে। বাহ্যিক ছায়া বিশেষভাবে কার্যকর, কারণ এতে সৌরতাপ কাচে পৌঁছার আগেই বাধাপ্রাপ্ত হয়।
ছাদও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। অপরিকল্পিত কংক্রিটের ছাদ দিনের বেলায় ভবনের ভেতরে তাপ প্রবেশের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠতে পারে। ছাদে ইনসুলেশন, প্রতিফলনশীল আবরণ, ছাদবাগান এবং বায়ু চলাচলযোগ্য ছাদ ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ স্থানে তাপ সঞ্চালন উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। সাদা বা প্রতিফলনশীল ছাদ কালো ছাদের তুলনায় অনেক কম সৌর বিকিরণ শোষণ করে। কিছু জলবায়ুতে প্রতিফলনশীল ছাদ সর্বোচ্চ সূর্যালোকের সময়ে ছাদের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি কমাতে পারে। এমনকি তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও তা ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা কমাতে এবং এসি চালানোর সময় কমাতে সহায়তা করতে পারে।
দেয়ালও স্থানীয় জলবায়ু বিবেচনায় উপযুক্ত ইনসুলেশন, ক্যাভিটি নির্মাণ, ছায়া এবং নির্মাণসামগ্রী দিয়ে নকশা করা যেতে পারে। শুধু সৌন্দর্যের জন্য জানালা অতিরিক্ত বড় করা উচিত নয়। উষ্ণ জলবায়ুতে অতিরিক্ত কাচের ব্যবহার শীতলীকরণের চাপ বাড়াতে পারে, বিশেষ করে পূর্ব ও পশ্চিমমুখী ফ্যাসাডে। লো-এমিসিভিটি কাচ, বাহ্যিক ব্লাইন্ড এবং ছায়াযুক্ত বারান্দা সৌরতাপ প্রবেশ কমাতে পারে; তবে এসব ব্যবস্থা অবশ্যই খরচ ও স্থানীয় প্রাপ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্বাচন করতে হবে। লক্ষ্য শুধু ভবনকে দেখতে ‘সবুজ’ করা নয়, বরং ভবনের বহিরাবরণকে একটি কার্যকর তাপীয় প্রতিবন্ধক হিসেবে গড়ে তোলা।
প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলও এসির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে, বিশেষ করে দিনের ও বছরের উপযুক্ত সময়ে। সঠিকভাবে স্থাপন করা খোলা যায় এমন জানালা, ছায়াযুক্ত খোলা অংশ, ক্রস-ভেন্টিলেশন, অভ্যন্তরীণ উঠান এবং উল্লম্ব বায়ু চলাচলের পথ ভবনের ভেতরে স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে। এর সঙ্গে সিলিং ফ্যান বা স্ট্যান্ড ফ্যান ব্যবহার করলে যান্ত্রিক শীতলীকরণ ছাড়াই আরামদায়ক থাকার সময় বাড়ানো সম্ভব। একটি সিলিং ফ্যান সাধারণত ৫০-৮০ ওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যেখানে একটি কক্ষের এসি ১ হাজার ওয়াট বা তারও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। তাই এসি ব্যবহারের কয়েক ঘণ্টার পরিবর্তে ফ্যান ব্যবহার করলেও উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে—প্রতিটি কক্ষকে স্থায়ীভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ‘বাক্স’ হিসেবে নকশা না করে মিশ্র পদ্ধতির (মিক্সড মুড) ভবন তৈরি করা। সবচেয়ে গরম ও আর্দ্র সময়ে এসি ব্যবহার করা যেতে পারে; আর যখন বাইরের পরিবেশ উপযোগী থাকে, তখন প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল ও ফ্যান ব্যবহার করা যেতে পারে। অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি ভবনে ছায়াযুক্ত বহিরাঙ্গন বা আধা-বহিরাঙ্গন স্থান তৈরি করা যেতে পারে, যাতে মানুষকে সবসময় একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে আরেকটিতে যেতে না হয়।
মানুষের আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে ভালো নকশার ভবনও শক্তি অপচয় করবে যদি ব্যবহারকারীরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে এসির তাপমাত্রা খুব কম রাখেন, দরজা খোলা রাখেন অথবা খালি কক্ষে এসি চালু রাখেন। এসির তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি থেকে ২৪-২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বাড়ালে বিদ্যুৎ খরচ কমতে পারে, কারণ কম্প্রেসরকে তুলনামূলক কম সময় কাজ করতে হয়। প্রকৃত সাশ্রয় ভবন ও যন্ত্রের ওপর নির্ভর করলেও জ্বালানি-সাশ্রয়ী নির্দেশিকায় প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে শীতলীকরণ শক্তির প্রায় ৫-১০ শতাংশ সাশ্রয়ের কথা প্রায় বলা হয়। কোনো বাণিজ্যিক ভবনে মাসে এসির পেছনে ১ লাখ টাকা ব্যয় হলে, মাত্র ১০ শতাংশ সাশ্রয়েও মাসে ১০ হাজার টাকা কম খরচ হতে পারে।
দায়িত্বশীল শীতলীকরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবেও বাংলাদেশ এগিয়ে এসেছে। আইইএ জানিয়েছে, বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে অফিসে এসি ব্যবহারের জন্য সাধারণত ২৪-২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ন্যূনতম সীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ ছোট মনে হলেও হাজার হাজার ভবনে প্রয়োগ করা হলে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার ওপর তা উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও অত্যন্ত জরুরি। অপরিষ্কার ফিল্টার, বাইরের ইউনিটে বাধা এবং রেফ্রিজারেন্টের সমস্যা বিদ্যুৎ ব্যবহার ৫-১৫ শতাংশ বা তারও বেশি বাড়াতে পারে এবং একই সঙ্গে শীতলীকরণের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
সমাধান হলো মানুষকে অস্বস্তিকর পরিবেশে বসবাস বা কাজ করতে বাধ্য করা নয়; বরং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাপীয় আরাম নিশ্চিত করা। সরাসরি সৌরতাপের নিচে স্থির বাতাসে বসে থাকা ব্যক্তির তুলনায় ছায়াযুক্ত ঘরে সিলিং ফ্যানের নিচে বসা একজন মানুষ তুলনামূলক বেশি তাপমাত্রাতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন। উপযুক্ত পোশাক, ফ্যান, প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল, ছায়া এবং ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ—এসব ব্যবস্থা অতিরিক্ত যান্ত্রিক শীতলীকরণের প্রয়োজন কমাতে পারে। পোশাকের পরিবর্তন, ব্যক্তিগত ফ্যান, জানালা খোলা এবং মিশ্র পদ্ধতির ব্যবহারকে অভিযোজনমূলক কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেছে আমেরিকান সোসাইটি অব হিটিং, রেফ্রিজেরেটিং অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং ইঞ্জিনিয়ারস (এএসএইচআরএই)।
অন্যান্য দেশ থেকেও বাংলাদেশের জন্য বাস্তব শিক্ষা রয়েছে। সিঙ্গাপুর উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছায়া, সবুজায়ন, বায়ু চলাচল, উচ্চ কার্যক্ষমতার ফ্যাসাড এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনার ব্যবহার দেখিয়েছে। জাপানের ‘কুল বিজ’ প্রচারণা কর্মক্ষেত্রে হালকা পোশাক এবং অপেক্ষাকৃত বেশি এসি সেট-পয়েন্ট ব্যবহারে উৎসাহিত করেছে, ফলে অপ্রয়োজনীয় এসি ব্যবহার কমেছে। ভারতের এনার্জি কনজার্ভেশন বিল্ডিং কোডও শক্তি-সাশ্রয়ী ভবন বহিরাবরণ, আলোকসজ্জা এবং শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহারে উৎসাহিত করেছে। এসব উদাহরণ দেখায় যে জ্বালানি সাশ্রয় শুধু উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং নীতি, নকশা-মানদণ্ড এবং মানুষের আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রয়োজন এসব মডেল সরাসরি অনুকরণ করা নয়; বরং দেশের নিজস্ব জলবায়ু, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সেগুলোকে পুনর্বিবেচনা করা। একটি মধ্যম আয়ের পরিবারের অ্যাপার্টমেন্টে সবসময় ব্যয়বহুল আমদানি করা প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই। সঠিক অভিমুখ, ছায়াযুক্ত জানালা, বায়ু চলাচলকারী করিডোর, প্রতিফলনশীল ছাদ, সিলিং ফ্যান, উপযুক্ত জানালা এবং দক্ষ এসি ব্যবস্থা অনেক সময় একটি ব্যয়বহুল ‘স্মার্ট বিল্ডিং’ ব্যবস্থার চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ নকশা পদ্ধতি ভবনের প্রাথমিক অবস্থা ও সংস্কারের মানের ওপর নির্ভর করে শীতলীকরণের চাহিদা ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।
একই নীতি বিদ্যমান ভবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রতিটি অদক্ষ ভবন ভেঙে নতুন করে নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ অপেক্ষা করতে পারে না। সংস্কার বা রেট্রোফিটিংকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। বিদ্যমান ভবনের ফ্যাসাডে বাহ্যিক ছায়া যুক্ত করা যায়; ছাদে ইনসুলেশন বা প্রতিফলনশীল আবরণ ব্যবহার করা যায়; অদক্ষ আলোকসজ্জা এলইডি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়; ফ্যান ও এসি উন্নত করা যায়; বায়ু চলাচল বাড়াতে জানালা পরিবর্তন করা যায় এবং এনার্জি মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার শনাক্ত করা যায়। এলইডি বাতি প্রচলিত ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের তুলনায় ৭৫-৮০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ইনভার্টার এসি পুরনো ফিক্সড-স্পিড এসির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম শক্তি ব্যবহার করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, জ্বালানি সংকট শুধু প্রকৌশলগত সমস্যা নয়; এটি স্থাপত্য ও মানুষের আচরণের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। আজ যে ভবন নকশা করা হচ্ছে, তা আগামী কয়েক দশক ধরে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদাকে প্রভাবিত করবে। বাংলাদেশ যদি অতিরিক্ত কাচঘেরা এবং এসিনির্ভর ভবন নির্মাণ অব্যাহত রাখে, তাহলে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু স্থপতি, প্রকৌশলী, ডেভেলপার, নীতিনির্ধারক এবং ভবন ব্যবহারকারীরা যদি একসঙ্গে এমন ভবন তৈরি করেন যা স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক ঠাণ্ডা থাকে, দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এবং দায়িত্বশীল আচরণকে উৎসাহিত করে, তাহলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ তাই হয়তো বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নয়, বরং নকশার টেবিলেই শুরু হতে পারে। একটি ভালোভাবে নকশা করা ভবন এমন এক ‘ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র’, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না, বরং বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যা, দ্রুত নগরায়ণ এবং বাড়তে থাকা শীতলীকরণ চাহিদার এ সময়ে জলবায়ু উপযোগী স্থাপত্যকে আর বিলাসিতা বা নান্দনিক পছন্দ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে বাংলাদেশের জাতীয় জ্বালানি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করতে হবে।
ড. সজল চৌধুরী: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এবং ভবন পরিবেশ, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক





