গত সোমবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আটতলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বণিক বার্তার সরজমিন প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ত্রুটিপূর্ণ লিফট থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনের মোট পাঁচ সিঁড়ির মধ্যে চারটিই বন্ধ ছিল। এ সময় এক সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। মৃতের তালিকায় ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীর তথ্যও গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন অগ্নিকাণ্ডে সরাসরি মৃত্যুর তথ্য অস্বীকার করেছে। কিন্তু এ পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে।
হাসপাতালে রোগীরা যান সুস্থ হতে, রোগ থেকে সুরক্ষা পেতে। কিন্তু সেখানে ব্যবস্থাপনাগত কারণে যখন দুর্ঘটনা ঘটে এবং রোগীর মৃত্যু হয় তখন প্রশ্ন করতেই হয় দেশের স্বাস্থ্য খাত কতটা রোগীবান্ধব? মনে পড়ে গত মে মাসে রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা। এর সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। এ কমিটির তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও দায়িত্বরত নার্স-স্টাফদের অবহেলার তথ্যসহ অবকাঠামোগত সংকট উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ যে হাসপাতালে গর্ভবতী নারীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শিশু জন্মের জন্য, সেখানকার হাসপাতালের অব্যবস্থাপনায় নবজাতকের মৃত্যু ঘটে—এর চেয়ে নির্মম ও হতাশাজনক আর কী হতে পারে!
বর্ণিত এ দুই ঘটনাই দেশের রোগীদের নিরাপত্তার উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তুলে ধরতে যথেষ্ট বলেই মনে হয়। আর যথেষ্ট মনে না হলে এর সপক্ষে ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যানও উপস্থাপন করা যায়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে দেশের হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৮৬২টি, যাতে প্রাণ গেছে ১৫ জনের এবং আহত হয়েছেন ২৬ জন। কেবল অগ্নিকাণ্ড নয়, ভুল চিকিৎসা, চিকিৎসায় অবহেলা, দীর্ঘসূত্রতা, চিকিৎসক সংকট, সরঞ্জাম না থাকাসহ নানা অভিযোগ ও সংকটে জর্জরিত স্বাস্থ্য খাত, যা রোগীদের নানা ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আজ (১৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবসে রোগীর নিরাপত্তা দিতে দেশ কতটা প্রস্তুত সেটা আবারো ভাবনায় চলে আসে।
অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য বলছে, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জন রোগীর একজন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকালে ক্ষতির শিকার হন, যে ক্ষতির বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য। এদিকে এ ক্ষতির বড় ঝুঁকিতে রয়েছে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীরা বলে সংস্থাটির তথ্য জানাচ্ছে। তাই এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘সেফ কেয়ার ফর লাইফ’, যার কেন্দ্রে রয়েছে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের নিরাপদ সেবা নিশ্চিতের বার্তা। কারণ দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল চিকিৎসা প্রয়োজন হওয়ায় হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস কিংবা শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত রোগীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রতি তিনজনে একজন রোগী চিকিৎসাকালীন কোনো না কোনো বিরূপ ঘটনার শিকার হন। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭৪ শতাংশ মানুষের মৃত্যুর পেছনে অসংক্রামক রোগের ভূমিকা রয়েছে। এ উদ্বেগ বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নির্ণয় শাখার যৌথ এক গবেষণার তথ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ রোগীর মৃত্যুতে অসংক্রামক রোগের দায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর দুর্বলতা, জটিল অসংক্রামক রোগের শহরকেন্দ্রিক চিকিৎসা কাঠামো, তৃণমূলে পর্যাপ্ত জনবল এবং অবকাঠামোর অভাব ইত্যাদি রোগীদের ঝুঁকি আরো বাড়িয়েছে। উপরন্তু মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি এখনো মানুষকে নিজের পকেট থেকে ব্যয় করতে হয়, যা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না। বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের মধ্যে যারা অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত, তাদের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য ব্যয় মেটানো আর্থিক চাপে পরিণত হচ্ছে। সেটি আরো বেড়ে যায় যখন প্রান্তিক পর্যায়ে সুচিকিৎসার সুযোগ না থাকায় শহরে পাড়ি দিতে হয়। এসব কাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের অনেকের পেশাদারত্বের অভাব, যা স্বাস্থ্য খাতের জবাবদিহিতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। রোগীর নিরাপত্তা শুধু ভবন-অবকাঠামোগত সুবিধার বিষয় নয়—এটি একটি সংস্কৃতির প্রশ্ন, যেখানে দায়বদ্ধতা, প্রশিক্ষণ ও মানবিক চর্চার সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। আর এগুলোর অনুপস্থিতি জানান দিচ্ছে যে রোগী নিরাপত্তা নিয়ে অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন এখনো অনেক দূরের বিষয় হয়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, ডেঙ্গু ও হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে যখন ক্রমেই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে তখন পুরো জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ বাড়ানো, হাম-রুবেলার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তর, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ পরিবেশ, জনবল বাড়ানো ইত্যাদির জন্য কাজ করেছে। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলা। শুধু বরাদ্দ বাড়ানো বা নতুন অবকাঠামো গড়ে ভবন তোলাই যথেষ্ট নয়—রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্যান্য উদ্যোগের পাশাপাশি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পেশাদারত্বে অভাব প্রমাণ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। আর এসব বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকির বিকল্প নেই।





