দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। এ ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক এভিয়েশন ও ট্রানজিট হাবে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের রয়েছে। কিন্তু সুদীর্ঘকাল পেরিয়ে গেলেও দেশের এভিয়েশন খাত সেদিকে যেতে পারেনি। উল্টো যাত্রীসেবার মানে আজও তুলনামূলক অনেক পিছিয়ে রয়েছে, বিশেষত রাষ্ট্রীয় আকাশ পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ২০২৫ সালে স্কাইট্র্যাক্সের করা শীর্ষ ১০০ এয়ারলাইনসের তালিকায় বিমান বাংলাদেশের নাম নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় এর অবস্থান ৯ নম্বরে। এমনকি দেশের এয়ারপোর্টও শীর্ষ ১০০ তালিকায় নেই বলে স্কাইট্র্যাক্সের চলতি বছরের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

মূলত দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও জনবলের অভাব, নেতৃত্বের সংকট, অপ্রতুল অবকাঠামো, নীতিগত জটিলতাসহ নানা কারণে দেশের এভিয়েশন খাত পিছিয়ে রয়েছে। বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভের বক্তাদের আলোচনায়ও এসব চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে। একটিমাত্র রানওয়ে দিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দর পরিচালনার কারণে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার জ্বালানি অপচয় হচ্ছে, বিলম্বিত হচ্ছে ফ্লাইট, যাত্রীসেবায় প্রভাব পড়ছে। আবার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাড়তি কর-ভ্যাট, অসম গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ আর লাইসেন্স জটিলতার মতো বিষয়গুলো স্থানীয় এয়ারলাইনসগুলোকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে।

এভিয়েশন খাতের উন্নয়নে এসব কাঠামোগত সংকটের সমাধান অপরিহার্য। সরকার এ খাতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতামূলক নিয়ম ও বিধিবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে ওই পলিসি কনক্লেভে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী জানিয়েছেন। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে কেবল নীতিগত সংস্কার যথেষ্ট নয়। উল্লিখিত সমস্যাগুলোর সমাধান তথা এ খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনার সংস্কৃতিও গড়তে হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে নজর দিতে হবে। আর এক্ষেত্রেও চাই পর্যাপ্ত বিনিয়োগ।

গত এক দশকে এভিয়েশন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ হয়েছে। তবে সেটি মূলত অবকাঠামো উন্নয়নে। মানবসম্পদ বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ অপ্রতুলই রয়ে গেছে। কিন্তু এগুলো ছাড়া এভিয়েশনে বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন এবং দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর বহর সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে বর্তমানে খাতটি একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশের ভিত্তি পেয়েছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে শাহজালাল বিমানবন্দরের যাত্রী ধারণক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। আধুনিক ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবা ব্যবস্থা চালু করার সুযোগ তৈরি হবে। অর্থাৎ অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এরই মধ্যে অনেকটা এগিয়েছে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, এসব অবকাঠামোগত সক্ষমতাকে অর্থনৈতিক শক্তি ও মানসম্মত সেবায় রূপান্তর করা যাবে কিনা।

কারণ বিমানবন্দর সম্প্রসারণের পাশাপাশি সেবার দক্ষতা, পরিচালন সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক পরিবেশে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না এলে বড় অবকাঠামো প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারবে না। ফ্লাইটের সময়সূচি ব্যাহত হওয়া ছাড়া গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, গেট ব্যবস্থাপনা, কার্গো পরিচালনা ও যাত্রীসেবায় অদক্ষতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এসব ক্ষেত্রে দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে আধুনিক টার্মিনালের সক্ষমতার একটি বড় অংশই অপচয় হবে।

এ কারণে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতা তৈরির উদ্যোগও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের একচেটিয়া ব্যবস্থা যদি সেবার মান ও দক্ষতা বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে থাকে তাহলে প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করে তার সংস্কার জরুরি। তবে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত করলেই হবে না; তাদের কর্মদক্ষতা, নিরাপত্তা, সময়ানুবর্তিতা ও সেবার মান পরিমাপের জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামোও থাকতে হবে।

এভিয়েশন হাব তৈরির ক্ষেত্রে দেশীয় এয়ারলাইনসের সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় বিমানকে এমন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, যার মাধ্যমে ভারত, নেপাল, ভুটানসহ আশপাশের দেশ থেকে যাত্রী ঢাকায় এসে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ কিংবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যেতে পারেন। এজন্য প্রয়োজন উপযুক্ত বহর, পর্যাপ্ত ফ্লাইট, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া, কার্যকর মার্কেটিং ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচি।

এখানে ট্রানজিট ব্যবস্থার উন্নয়ন করাটাও বিশেষভাবে জরুরি। কয়েক ঘণ্টার ট্রানজিটে যাত্রীকে ইমিগ্রেশন জটিলতার মধ্যে ফেললে কিংবা বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, খাবার ও অন্যান্য সুবিধা না থাকলে ঢাকাকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে বেছে নেয়ার কোনো কারণ যাত্রীর থাকবে না। ফলে দ্রুত ট্রানজিট, সহজ স্থানান্তর, উন্নত লাউঞ্জ ও খাবার সুবিধা, প্রয়োজন অনুযায়ী ভিসা সহজীকরণ এবং নিরবচ্ছিন্ন ব্যাগেজ ট্রান্সফারের মতো বিষয়কে এভিয়েশন নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে।

এভিয়েশন অর্থনীতির আরেকটি বড় সম্ভাবনা এয়ার কার্গো। তৈরি পোশাক, ওষুধ, হিমায়িত মাছ, ফুল ও তাজা কৃষিপণ্যের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবহন গুরুত্বপূর্ণ। অথচ কার্গো ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও অতিরিক্ত ব্যয় থাকলে বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই আধুনিক কার্গো টার্মিনাল, কোল্ড চেইন, কার্গো ভিলেজ ও দ্রুত কাস্টমস ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। বিমানবন্দরকে শুধু যাত্রী চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে না দেখে বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

পর্যটনের ক্ষেত্রেও এভিয়েশন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুট, পর্যটন অবকাঠামো ও ভিসা সুবিধার সমন্বয়। একইভাবে সিলেট, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বিমানবন্দরকে নির্দিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। সব বিমানবন্দরকে একই ধরনের অবকাঠামো দিয়ে সাজানোর বদলে কোন বিমানবন্দরের কোন ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে, তার ভিত্তিতে বিশেষায়িত পরিকল্পনা করা অধিক কার্যকর হবে।

দেশীয় এয়ারলাইনসের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি পরিচালন ব্যয়। জ্বালানি, উড়োজাহাজ লিজ, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ডলারে পরিশোধযোগ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেবার ব্যয় বাড়লে দেশীয় ক্যারিয়ারগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় এয়ারলাইনসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু বহর বাড়ানো যথেষ্ট নয়। ব্যবসার ব্যয়ও যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে হবে। জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা, কর ও ফি কাঠামোর পুনর্বিবেচনা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তার নীতি এক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশে বিমান রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা তৈরি করাও জরুরি। আন্তর্জাতিক মানের মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল বা এমআরও সুবিধা গড়ে উঠলে দেশীয় এয়ারলাইনসের বৈদেশিক ব্যয় কমার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে দক্ষ পাইলট, প্রকৌশলী, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারসহ প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনা জনবল তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। এভিয়েশন খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পরিকল্পনা না থাকলে ভবিষ্যতে অবকাঠামো থাকলেও তা পরিচালনার সক্ষমতার ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, এয়ারলাইনস ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ থাকতে হবে।