একটি পাবলিক পরীক্ষায় ৫৬ হাজারের বেশি উত্তরপত্রের ফল যদি পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। আমি প্রথম ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষক হই ১৯৯১ সালে। সে সময় থেকে দেখে আসছি, প্রতি বছর একই ধরনের ভুল হচ্ছে। বরং এসব ভুলের সংখ্যা ও ধরন প্রতি বছরই বেড়ে চলেছে। বোর্ড পরীক্ষক থাকাকালে প্রতিটি মিটিংয়ে অংশ নিতাম। দেখতাম, মিটিংয়ে অর্ধেকের বেশি শিক্ষক উপস্থিত থাকতেন না। অর্থাৎ সম্মিলিত আলোচনা ও সিদ্ধান্তের অনেক কিছুই সমন্বিতভাবে হতো না। লিখে দেয়া নিয়মকানুনও অনেকে পড়ে দেখতেন না।

বোর্ড পরীক্ষক ও বোর্ডের প্রশ্ন প্রণেতা হিসেবে যত সমস্যা দেখে এসেছি, তার সবই বহুবার বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করেছি, লিখেছি। কিন্তু দেখছি, সমাধানের চেয়ে সমস্যা যেন বেড়েই চলছে। এটি এমন ধরনের সমস্যা নয় যে হুট করে একটি বিরাট বক্তব্য দিলাম, কিছু শিক্ষককে ভয় দেখালাম আর তাতেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন ব্যাপক গবেষণা, সুপরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি কাজ ও নতুনত্বের ধারণা।

কিন্তু কে এসব নিয়ে চিন্তা করবে? আমরা হঠাৎ কিছু করা, বড় বড় পরিকল্পনা করা, বিশ্বের বড় বড় দেশ কী করছে তা দেখা এবং সেগুলোর অনুকরণে অনেক কিছু করার কথা সবসময় শুনি। কিন্তু আসল সমস্যায় হাত দেয়া হয় না।

শিক্ষক, বোর্ড, মূল্যায়ন ব্যবস্থাপনা তথা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাপনার গলদগুলো দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা কথা বলি কিছু ইউটোপিয়ান ধারণা নিয়ে।

১৯৯১ সাল থেকে দেখে আসছি, এক শিক্ষার্থী গণিতে ৮২ পেয়েছিল, কিন্তু গোল্লা পূরণ করা হয়েছিল ২৮। ওই সময়ে ৮২ পাওয়া আর বর্তমান যুগের তথাকথিত উদার নম্বর দিয়ে ৮২ করা এক কথা নয়। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক কারোই ঘুম ছিল না। তারা বোর্ডের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। অনেক পরে দেখা গেল, ছেলেটি আসলেই ৮২ পেয়েছিল।

শিক্ষার্থীদের এই যে মানসিক অশান্তি ও ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সে দায়দায়িত্ব কে নেবে? সে সময়ে দেখা যেত, একটি বোর্ডে এক-দুটি ঘটনা এ রকম ঘটছে। কিন্তু বর্তমানে কী হচ্ছে? শত শত, এবার দেখা গেছে হাজার হাজার। তাহলে এ মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বস্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা কোথায় গিয়ে ঠেকে?

প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন শিক্ষার্থী ফল পুনর্মূল্যায়নে আবেদন করেছিলেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি লিখিত পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে ২৭ হাজার ৮৩৬ শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে এবং ৫৬ হাজার ২৫৯টি খাতায় নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে।

প্রতি বছরই লিখি, তাড়াহুড়ো করে শিক্ষকদের খাতা দেখানো ঠিক নয়। পূর্ববর্তী সরকারের মন্ত্রীরা ঢালাওভাবে উল্লাস প্রকাশ করতেন পাবলিক পরীক্ষার ফল তিন মাসের বেশি সময় থেকে দুই মাসের কম সময়ে প্রকাশ করা হয়েছে। বহুবার বলেছি, এটি কোনো অর্জন নয়। কে শোনে কার কথা! এ সরকারও তাই করল—তাড়াহুড়ো করে ফল প্রকাশ করল।

এখন এত পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। এটি কোনো গ্রহণযোগ্য পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া হতে পারে না। দিন যত যাচ্ছে, আমরা তত মেশিন নির্ভর হয়ে পড়ছি। কিন্তু মানবিকতা কমেই যাচ্ছে। আমাদের সময়ে শিক্ষকরা নিজের হাতে খাতা দেখতেন, ফল তৈরি করতেন। এখন এত কম্পিউটার ও ডিভাইস দিয়ে ফল তৈরি করা হয়। কিন্তু ফল উপস্থাপনের এ প্রক্রিয়া যদি এত বড় ধরনের ভুলের জন্ম দেয়, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়।

এবারের পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়নে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থীর নতুন করে জিপিএ ৫ পাওয়া, ফেল থেকে পাস, গ্রেড পরিবর্তন এবং সর্বোচ্চ সংখ্যক খাতায় নম্বর পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। ফলে গত ১০ আগস্ট ফল প্রকাশের পর থেকে টানা এক মাস ধরে চলা মানসিক ট্রমা থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এমন পরিস্থিতি কি আদৌ কাম্য?

দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক বোর্ডের খাতা দেখতে চান না। প্রধান কারণ, তারা প্রাইভেট পড়িয়ে অনেক উপার্জন করেন। বোর্ডের খাতা দেখে তারা কত টাকা পাবেন? কিন্তু বোর্ডের খাতা দেখা মানে শুধু কিছু উপার্জন নয়। এটি পুরো শিক্ষাদান পদ্ধতির একটি মূল্যবান অংশ। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলে এবং বছরের পর বছর এ নিয়ে কাজ না করলে পুরো শিক্ষকতা বিষয়টি আয়ত্তে আসে না; একজন প্রকৃত শিক্ষক হওয়াও সম্ভব নয়।

এক্ষেত্রে সরকার কী করবে? সরকার কি জোর করে শিক্ষকদের দিয়ে খাতা পরীক্ষণ করাবে? তাতে কী লাভ হবে? ভালো প্রতিষ্ঠানের ভালো শিক্ষকদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

বোর্ড বাধ্য হয়ে অনেক অনভিজ্ঞ, একেবারে নতুন ও ডিমোটিভেটেড শিক্ষকের মাধ্যমে খাতা মূল্যায়ন করিয়ে থাকে। এ ধরনের বহু শিক্ষককে দেখেছি, যারা বোর্ডের খাতা দেখার জন্য একেবারেই উপযুক্ত নন। অথচ বোর্ড থেকে খাতা নিয়ে এসে তাদের স্ত্রী, পুত্র কিংবা শিক্ষার্থীদের দিয়ে খাতা পরীক্ষণ করিয়ে থাকেন।

বোর্ডকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফল তৈরি করতে হবে, পিছিয়ে থাকা যাবে না। আমার মনে আছে, আমি কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে থাকাকালীন কুমিল্লা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক খাতা জমা দিয়ে আসার পর আবার খাতা নেয়ার অনুরোধ করতেন। কলেজে ফোন করতেন—তখন মোবাইল ছিল না। এর দুটি কারণ ছিল। একটি হলো, তাদের বিশ্বাস ছিল ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকরা ভালোভাবে খাতা মূল্যায়ন করেন। দ্বিতীয়ত, এত খাতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কারা দেখবেন?

তাই অনেকে তিন-চারবার করেও বোর্ডের খাতা আনতেন। এখনো অনেকেই তা করেন, যা ঠিক নয়। আমি নিজে কখনো একবারের বেশি খাতা আনতাম না।

আবার কিছু অনুপযুক্ত শিক্ষক বোর্ডের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে, বিশেষ করে কন্ট্রোলারের পিএর সঙ্গে লাইনঘাট করে, বারবার খাতা আনেন। গত সরকারের আমলে যেহেতু ফেল করার নজির তেমন ছিল না, তাই এসব শিক্ষক বেশি বেশি নম্বর দিয়ে পাস করানোর কাতারে শামিল হতেন। ফলে কোনো সমস্যা ধরা পড়ত না।

এর সঙ্গে ডিজিটাল যুগে বহু ডিজিটাল সমস্যাও এসে হাজির হয়েছে। দেশের একমাত্র শিক্ষা বিষয়ক দৈনিক পোর্টাল দৈনিক শিক্ষক ডটকম ও প্রিন্ট পত্রিকা দৈনিক আমাদের বার্তা বোর্ডের কম্পিউটার সেকশনের দুর্নীতি, গাফিলতি ও অনভিজ্ঞতার যে চিত্র তুলে ধরেছে, সরকার বিষয়টিতে জোর দিলে সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে।

আমি বহুবার বলেছি, সব ধরনের শিক্ষককে খাতা পরীক্ষণের দায়িত্ব দেয়া যাবে না। খাতা দিতে হবে অল্পসংখ্যক পরীক্ষককে এবং পরীক্ষকদের পারিশ্রমিক একটু বেশি দিতে হবে। তার পরও খাতা দ্বিতীয় পরীক্ষক দিয়ে দেখাতে হবে।

এ বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠা করতে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও কন্ট্রোলারই যথেষ্ট—যেহেতু বোর্ডগুলো স্বায়ত্তশাসিত। কিন্তু আমাদের এসব পদে যারা আসেন, তারা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ছাড়া কিছু করেন না, করতে চান না কিংবা করতে পারেন না। কারণ তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বচ্ছ ও পেশাদার নয়। নিয়োগ হয় কে কার আত্মীয়, কে কার বন্ধু, কে কোন পার্টিতে কতটা অবদান রেখেছেন—এসব বিবেচনায়।

ফলে এসব বোর্ডের কন্ট্রোলার বা চেয়ারম্যান অনেক কিছুই করতে পারেন না। দেখা যায়, অখ্যাত কোনো কলেজের অধ্যক্ষ, যিনি সারা জীবন হয়তো শিক্ষা-সংক্রান্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তিনিই উপরোক্ত কোনো না কোনো কারণে বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কিংবা চেয়ারম্যান হয়ে গেছেন। তার পক্ষে বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না।

এখানে নৈতিক সাহস থাকতে হয়, পড়াশোনা জানতে হয়, কাজ করতে হয়, নেতৃত্ব দিতে হয়। শিক্ষার মূল সমস্যাগুলোর ভেতরে ঢোকার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রধান অতিথি হিসেবে নয়, শিক্ষক হিসেবে যেতে হয়। নিজে দায়িত্ব নিয়ে অনেক কিছু করতে হয়।

যারা শিক্ষা প্রশাসনের পদগুলোয় আসেন, তারা অনেক সময় ভালো শিক্ষকও নন, ভালো প্রশাসকও নন। ভালো ও প্রকৃত শিক্ষক হলে তারা এসব পদে যেতে চাইবেন না। অথচ একদল শিক্ষক মারাত্মক লবিং করে এসব পদ দখল করেন।

শ্রেণীকক্ষে শিক্ষাদান এখন অনেক চ্যালেঞ্জিং। দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নৈতিকতা হারানোর এ সময়ে কিছু শিক্ষক শ্রেণীকক্ষ ছেড়ে বাঁচতে চান। এটিও আরেকটি বাস্তবতা। তারা যখন শিক্ষা প্রশাসনের কোনো পদে আসেন, তখন ভালো প্রশাসকও হতে পারেন না, কারণ সে ধরনের কোনো অভিজ্ঞতা তাদের থাকে না।

তারা কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালীন সরকারি সংগঠনের তথাকথিত ছাত্রনেতাদের সঙ্গে মানিয়ে চলে এসেছেন। এর মাধ্যমে শিক্ষা প্রশাসন শেখা যায় না। বোর্ডে এসে নতুনভাবে তারা কী করবেন? তাদের একার পক্ষে অনেক কিছু করাও সম্ভব নয়।

তবে শুরুটা তাদেরই করতে হবে। কারণ রাজনীতিবিদ কিংবা সরকারে যারা থাকেন, তারা এসব সমস্যা পুরোপুরি বুঝতে চাইবেন না। সমাধানও হয়তো সেভাবে দিতে যাবেন না। এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষকদেরই।

আপনি চেয়ারম্যান হন কিংবা কন্ট্রোলার—মনে রাখতে হবে, আপনি একজন শিক্ষক। আপনি পুরো শিক্ষকসমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

কয়েক বছর আগে এনসিটিবিতে দেশের সব বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের ডাকা হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে আমাকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছিল কিছু কথা বলার জন্য। সেদিন বিভিন্ন বোর্ডের প্রশ্নের অনেক সমস্যা নিয়ে কথা বলেছিলাম। কয়েকজন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেছিলেন, ‘বোর্ডের প্রশ্নও করেন শিক্ষকরা, প্রশ্ন মডারেটও করেন তারা। এসব সমস্যা থাকলে আমরা কী করব?’

এ কথার মধ্য দিয়েই বোর্ডের অনেক কিছু উঠে আসে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা মনে করেন না তারাও শিক্ষক। তারা প্রশাসকের ভূমিকায় থাকতে চান। ফলে কোনোটিই হচ্ছে না।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক