জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) একজন নাগরিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নথিগুলোর একটি। প্রতিটি নাগরিকের একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর এনআইডি থাকা বাধ্যতামূলকও। এর ভিত্তিতে ভোটাধিকার, পাসপোর্ট, শিক্ষা, চাকরি, সামাজিক নিরাপত্তা, কর ব্যবস্থা, ব্যাংকিংসহ রাষ্ট্রের বহু সেবা পেয়ে থাকেন নাগরিকরা। তবে এনআইডি তৈরির ক্ষেত্রে অনেক সময় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল হতে পারে; ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ যে কারোর পক্ষ থেকেই হতে পারে। ফলে এনআইডির তথ্য সংশোধনের সুযোগ থাকার প্রয়োজন রয়েছে বটে। কিন্তু এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নাগরিকরা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য পূরণে এনআইডির তথ্য পরিবর্তনের জন্য আবেদন করবেন, সেটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে ১০ বছর বয়স কমানোর আবেদন কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না, গ্রহণীয় তো নয়ই।
অথচ বয়স সংশোধনের আবেদনই নির্বাচন কমিশনে (ইসি) বেশি জমা পড়েছে বলে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, যার হার প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ। কারো ক্ষেত্রে বয়স এতটা কমানোর আবেদন করা হয়েছে যে তিনি নিজের সন্তানের চেয়ে বয়সে ছোট হয়ে যাচ্ছেন। কারো প্রস্তাবিত জন্মতারিখ অনুযায়ী ভোটার হওয়ার সময় বয়স দাঁড়াচ্ছে মাত্র ১০ বছর। এগুলো নিছক এনআইডির তথ্য পরিবর্তনের আবেদন যে নয় তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না, বরং রাষ্ট্রীয় পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য কীভাবে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন উদ্দেশ্যে পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার এটি ফৌজদারি অপরাধও। তার পরও নাগরিকদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতার উচ্চমাত্রা রয়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। সুতরাং এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো বয়স পরিবর্তনে আবেদন করা হলে কিসের ভিত্তিতে সেটি গ্রহণ করা হবে। জন্মতারিখের প্রাথমিক সূত্র হলো জন্মনিবন্ধন। এর তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে শিক্ষা সনদ, এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরি হয়। সুতরাং এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো জন্মসনদ, যেটা শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যেই করার নিয়ম রয়েছে বর্তমানে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো এখনো দেশের শিশুদের বড় একটি অংশ জন্মনিবন্ধনের বাইরে রয়ে যাচ্ছে। গত বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ এক জরিপের তথ্যে উল্লেখ করা হয়, অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সের শিশুদের জাতীয়ভাবে জন্মনিবন্ধনের হার ৫৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫৬ শতাংশ। আধুনিক যুগে যখন জন্মসনদের মতো জরুরি নথির ডিজিটাল, হালনাগাদকৃত সমৃদ্ধ তথ্যভাণ্ডার থাকা সমীচীন ছিল, সেখানে আজও দেশের শিশুদের একটি বয়স পর্যন্ত জন্মনিবন্ধনই হচ্ছে না। তাহলে ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা না থাকার সময়ে জন্ম নেয়া নাগরিকদের জন্মসনদ, এনআইডির প্রকৃত তথ্য যাচাই করাটা আরো কঠিন সেটা অনুমান করা যায়। এমনকি স্থানীয় সরকারের আওতায় স্থানীয়ভাবে জন্মসনদ জালিয়াতিরও বহু নজির রয়েছে। সুতরাং জন্মসনদের তথ্যভাণ্ডার সবার আগে সুষ্ঠুভাবে লিপিবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। এতে আবেদনের সুযোগটা বন্ধ করা যেতে পারে। নয়তো ভবিষ্যতে কেবল ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে এ ধরনের আবেদনের সংখ্যা আরো বাড়বে বৈ কমবে না। এর বাইরে বয়স সংশোধনের আবেদনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।
বিদেশে যাওয়ার জন্য বয়স বাড়িয়ে দেখানো, পরবর্তী সময়ে পাসপোর্ট বা শিক্ষাগত সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে বয়স কমানো, চাকরির মেয়াদ বাড়ানো কিংবা অন্য কোনো সুবিধা নেয়ার চেষ্টা—সব মিলিয়ে বয়স সংশোধনের আবেদন বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরনো পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন ও এনআইডির তথ্যের অসামঞ্জস্য। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু নাগরিকদের অনৈতিক চর্চায় সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্রের বিভিন্ন পরিচয়-সংক্রান্ত ডেটাবেজের মধ্যকার সমন্বয়হীনতাও এর অন্যতম কারণ। যেমন ২০১৪-১৯ সালে পাসপোর্ট অধিদপ্তর এনআইডি ডেটাবেজ সরাসরি যাচাই না করেই স্থানীয় জন্মসনদের ভিত্তিতে বিপুলসংখ্যক মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ইস্যু করেছে। ফলে যখন এখন ই-পাসপোর্টে এনআইডি তথ্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তখনই পুরনো অসংগতিগুলো একে একে সামনে আসছে। সুতরাং সমন্বিত কিছু উদ্যোগ অবশ্যই নিতে হবে, যা বয়স সংশোধনের অস্বাভাবিক আবেদন বন্ধে সহায়ক হবে। নয়তো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরও চাপ বাড়বে।
এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সাম্প্রতিক যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটি স্বাগত জানানোর মতো। শুধু কোনো একটি সনদ দেখে বয়স পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত না নিয়ে পারিবারিক ধারাবাহিকতা (ফ্যামিলি ট্রি) যাচাইয়ের উদ্যোগ কার্যকর হোক সেটি কাম্য। তবে শুধু যাচাই কঠোর করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদ ও অন্যান্য সরকারি নথির সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়তে হবে। একই ব্যক্তির জন্মতারিখ একেক সরকারি নথিতে একেক রকম থাকার সুযোগ যতদিন থাকবে, ততদিন সংশোধনের আবেদনের চাপও থাকবে এবং জালিয়াতির সুযোগও থেকে যাবে। তবে অব্যশই বিবেচনায় রাখতে হবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক নাগরিকের জন্মনিবন্ধন বা শিক্ষাগত নথিতে পুরনো ভুল থাকতে পারে। তাদের বৈধ সংশোধনের পথ কঠিন করে দিলে হয়রানি বাড়বে। তাই প্রকৃত ভুল সংশোধনের উপায় যেন সহজ হয় সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি।





