ফারাও শাসনে বন্দিদশা পার করছে হিব্রু জাতি।
দুর্ভাগ্যে বিবশ প্রতিটা মুহূর্ত। দীর্ঘদিন তাদের প্রার্থনা ছিল একজন নেতার। এক সময়
স্রষ্টা মঞ্জুর করলেন প্রার্থনা। ভাগ্য বদলাতে তাদের ভেতরেই জন্মগ্রহণ করলেন মোজেস।
সমস্ত প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়িয়ে মোজেস উচ্চারণ করলেন, ‘লেট মাই পিপল গো’।
মোজেসের সঙ্গে পেলের এখানেই সাদৃশ্য। তার
হাত ধরেই ব্রাজিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ স্পর্শ করে শিরোপা। একই
সময়ে তিনি হয়ে উঠেন ফুটবলের ময়দানে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের কণ্ঠস্বর।
বিশ্বকাপের যাত্রা ১৯৩০ সালে। তারও আগে থেকে
গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে যুক্ত ছিল ফুটবল। তখন ফুটবলের আসর বলতেই উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার
দাপট। ঊনিশ শতকের শেষ দিকে ফুটবলে নাম লেখায় ব্রাজিল। সারা দেশ ফুটবল বলতে উন্মাদ।
তারপরও যেন কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না।
১৯৫০ সালে ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে হার পরিণত হয় জাতীয় শোকে। মারাকানার সেই ঘটনায় দেশব্যাপী বহু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। সংবাদপত্রগুলোও বিশ্বাস করতে পারেনি। হতাশ ব্রাজিল জার্সি বদল করে। কিন্তু হতাশার পরিবর্তন ঘটেনি পরের আসরেও। ১৯৫৮ সালে ভাগ্য বদল ঘটল, যার নায়ক টিনএজার পেলে। ব্রাজিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথমবারের মতো স্পর্শ করল শিরোপা।
ছবি: এপি
ব্রাজিল থেকে কখনোই নিশ্চিহ্ন হয়নি বৈষম্য।
প্রথম দিকের ফুটবল বলতেই ছিল শ্বেতাঙ্গদের খেলা। বর্ণবাদের প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা
করে জাতীয় দলে প্রথম আসেন আর্থার ফ্রেডেনরিখ। বাবা জার্মান হলেও মা ছিলেন আফ্রিকান
বংশোদ্ভূত। ১৯১৪ সালে জাতীয় দলে তার প্রবেশের পরও সহ্য করতে হয় শ্বেতাঙ্গদের বিদ্রুপ।
১৯২১ সালে সাউথ-আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপে ফ্রেডেনরিখকে অংশগ্রহণ করতে না দেয়ার কারণ
বর্ণবাদ।
ফুটবল পাগল কৃষ্ণাঙ্গ মানুষগুলো নিজেদের সাদা
দেখাতে নানা কৌশল অবলম্বন করেছে। কখনো মুখে ময়দা মেখে আবার কখনো চুল সোজা করে। তবে
পেলে যখন ১৯৫৮ সালের জাদু দেখালেন, অনেকটাই বদলে গেল দৃশ্যপট। দরিদ্র পরিবার থেকে ওঠে
আসা কৃষ্ণাঙ্গ পেলে যেন ব্রাজিলকেই শুধু গর্বিত করেনি, মুহূর্তেই পরিণত হন সকল কৃষ্ণাঙ্গ
ও দরিদ্র মানুষের কণ্ঠস্বরে।
এ দিক থেকে মার্টিন লুথার কিং ও মোহাম্মদ
আলীর সঙ্গে পেলের তুলনা করা যায়। তিনি পরিণত হন নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণায়। পেলেই
তাদের শক্তি। সম্প্রতি নেইমার পেলের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে পেলের সেই ভূমিকার
কথাই স্মরণ করেছেন।
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ প্রথম রঙিন সম্প্রচারের
সাক্ষী হয় দুনিয়া। পেলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ছিল চোখে লেগে থাকার মতো। জুলে রিমে
কাপের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে যায় ব্রাজিলের নামে। পরপর চারটি আসরের মধ্যে তিনটিতেই
চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। একটা জাতি এর চাইতে আর কত বেশি পেতে পারে? এই প্রাপ্তির পেছনে
পেলের ভূমিকা ব্যাপক।
পেলেই প্রথম বৈশ্বিক ফুটবলার। প্রথমবারের মতো প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যের মানুষ একজন ফুটবলারকে ভালোবেসেছে। ব্রাজিল ভালোবেসে তাকে ঘোষণা করেছে জাতীয় সম্পদ হিসেবে। পেলের জন্য ইউরোপে যাওয়ার সুযোগ ছিল না, এমন না। তিনি ভালোবেসেছিলেন ব্রাজিলকে। ব্রাজিলের ফুটবল ও সান্তোস ক্লাবকে। যে ভালোবাসতে পারে, সে ভালোবাসা পায়।
ছবি: এপি
পেলে গত শতাব্দীর সেরা ফুটবলার। রেকর্ডের
পর রেকর্ড রয়েছে নামের পাশে। টিনএজ হিসেবে ফাইনালে জোড়া গোল, হ্যাটট্রিক কিংবা তিনবার
শিরোপা ছোঁয়া। ২১ বছরের পেশাগত ফুটবলের ক্যারিয়ারে ১ হাজার ২৮৩ গোল করেছেন। ব্রাজিলের
হয়ে ৯২ ম্যাচে ৭৭ গোল। পেয়েছেন নানা সম্মাননা। তারপর পেলের উচ্চতা ছিল তার শিশুসুলভ
সরলতায়। মাঠের বাইরে তিনি জড়িয়ে ছিলেন শিশুর নিরাপত্তা, কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার প্রতিষ্ঠা,
দারিদ্র নিরসন ও শিক্ষার সংস্কারে। অংশগ্রহণ করেছেন ইউনিসেফের মতো সংস্থার গৃহীত উদ্যোগেও।
পেলের সফলতার দাগ তার ব্যর্থতাতে লেগে রয়েছে।
১৯৭০ সালের ম্যাচে পেলের দুর্দান্ত একটি হেড ফিরিয়ে দেন ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক গর্ডন
ব্যাঙ্কস। সর্বকালের ‘সেরা সুরক্ষা’ বলে তকমা পায় সেটি। গর্ডন ব্যাঙ্কস সমাদৃত হন বিপুলভাবে।
আর তার নামের পাশে জড়িয়ে আছে কিংবদন্তি পেলের নাম।
নিজেকে জনপ্রিয় করে মূলত পেলে ফুটবলকেই জনপ্রিয়
করেছেন। ব্রাজিলকে জনপ্রিয় করেছেন। পেলের স্পর্শেই ফুটবল শিল্প হয়েছে। সুন্দর হয়েছে।










