ইউরোপে শরৎ মানেই প্রকৃতির রঙিন উৎসব। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকেই সবুজ গাছের সারি ধীরে ধীরে সোনালি, লালচে, কমলা আর তামাটে রঙ ধারণ করে। ফ্রান্সের বনে, ইতালির পাহাড়ে বা জার্মানির রাস্তার পাশে সারি সারি ম্যাপল, বিচ, ওক সবাই যেন সাজে শরতের ছোঁয়ায়। ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করলে সূর্যের আলোয় পাতা ঝলমলিয়ে ওঠে। দেখে মনে প্রকৃতি নিজেই তুলির টানে নতুন এক চিত্রকর্ম এঁকে দিয়েছে।
কিন্তু কেন এ রঙের বদল? পাতার সবুজ হারিয়ে গিয়ে লাল, হলুদ বা বেগুনি হওয়ার এ প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে গভীর বিজ্ঞান ও কিছু অপূরণীয় রহস্য।
পাতা যখন হলুদ হয়, তখন আসলে কোনো নতুন রঙ তৈরি হয় না। পাতার ভেতর সবসময়ই থাকে ক্যারোটিনয়েডস নামের রঞ্জক পদার্থ (এ উপাদান গাজর, কুমড়ো বা লেবুতেও থাকে)। গাছ যখন শীতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তখন পুষ্টি নিজের কাণ্ডে ফিরিয়ে নেয়। ফলে পাতার ক্লোরোফিল ভেঙে গিয়ে সবুজ রঙ হারিয়ে ফুটে ওঠে হলুদ রঙ।

লাল বা বেগুনি পাতার ক্ষেত্রে কারণটা একই হলেও সামান্য ভিন্নতা রয়েছে। পাতার সে রঙ আসে অ্যান্থোসায়ানিনস নামের রঞ্জক থেকে। শরতের ঠান্ডা আর আলোর তারতম্যে এ পদার্থ তৈরি হয়, আর তখনই গাছের চেহারা বদলে যায়।
বিজ্ঞানীরা বলেন, পাতার এ রঙ বদল কেবল সৌন্দর্যের খেলা নয়। বরং এটি বিবর্তনের এক কৌশল। কোটি কোটি বছর ধরে এটি টিকে আছে, মানে গাছের জন্য এর কোনো না কোনো সুবিধা নিশ্চয়ই আছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সব গাছ রঙ বদলায় না। ইউরোপের মূলভূমিতে বিচ, ওক ও সিকামোরের পাতাগুলো সাধারণত হলুদ হয়ে যায়। কিন্তু লালচে ম্যাপল বা সামাচের মতো গাছগুলোর পাতা পুরোপুরি বদলে যায়। এা মূলত ইউরোপে এসেছে এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার দেশ থেকে। তাই আবহাওয়া পরিবর্তনে নিজেদের টিকিয়ে রাখতেই তাদের এ পরিবর্তন।

একটি জনপ্রিয় তত্ত্ব বলছে, পাতার রঙ বদল আসলে একধরনের সূর্যালোক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। গ্রীষ্ম শেষে সূর্যের আলো যখন তীব্র থাকে কিন্তু তাপমাত্রা কমে যায়, তখন পাতা সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত আলোর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অ্যান্থোসায়ানিনস রঞ্জক পাতাকে রক্ষা করে। বিরূপ প্রকৃতি থেকে বাঁচতে গাছ নিজের জন্য সানস্ক্রিন পরে নেয়।
জার্মানির লেইপজিগ ইউনিভার্সিটির গবেষকরা জানিয়েছেন, শরতের শীতল বাতাস আর হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়া গাছকে বাধ্য করে এ রঞ্জক উৎপাদনে, যাতে পাতা অল্প সময়ের জন্য হলেও জীবিত থাকে আর গাছ পুষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারে।
আরেকটি তত্ত্ব বলছে, লাল পাতার রঙ আসলে পোকামাকড়কে সতর্ক করার সংকেত। অনেক পোকা, যেমন অ্যাফিড বা মাইট, শরতের সময় পাতায় ডিম পাড়ে। তারা উজ্জ্বল লাল বা বেগুনি পাতাকে মৃত বা বিষাক্ত মনে করে দূরে থাকে। তবে সব গবেষকই এই ধারণা সত্য বলে মেনে নেয়নি। কারণ এসব পোকা রঙ দেখতে পায় না। পাতার পুষ্টিহীনতা বুঝতে পেরে তারা দূরে সরে যায়।










