সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা বৈশ্বিক তেলবাজারে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। গত বৃহস্পতিবার এ হামলার পর পাইপলাইনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। বিশ্লেষকদের মতে, হামলার জেরে পাইপলাইনটি বন্ধের ঘটনা জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজারের জন্য আরেকটি ধাক্কা।

সৌদির পূর্বাঞ্চলের প্রধান তেল উৎপাদন ক্ষেত্রগুলোকে লোহিত সাগরের বন্দর ইয়ানবুর সঙ্গে যুক্ত করেছে পাইপলাইনটি। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা যায়। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন করা তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হয় পাইপলাইনটি দিয়ে। পরে তেল ট্যাংকারে ভরে সমুদ্রপথে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়।

সৌদির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের পরিপ্রেক্ষিতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব ঘিরে হামলা জোরদার করেছে। ফলে হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেলবাজারে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

এই ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন আসলে কী

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ‘পেট্রোলাইন’ নামেও পরিচিত। ১৯৮১ সালে নির্মিত প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পাইপলাইন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের আবকাইক এলাকার তেলক্ষেত্র থেকে অপরিশোধিত তেল আরব উপদ্বীপের ওপর দিয়ে লোহিত সাগরের বন্দর ইয়ানবুতে নিয়ে যায়। এর ফলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়।

পাইপলাইনটির সর্বোচ্চ পরিবহন সক্ষমতা প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় প্রকৃত পরিবহন এর চেয়েও অনেক কম ছিল। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে। হুথিদের হামলার কারণে লোহিত সাগরপথ ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়ায় এটি জানুয়ারির পর সর্বনিম্ন মাসিক প্রবাহ।

তবে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম পাঁচ মাসে সৌদি আরব পশ্চিমাঞ্চলের দিকে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিমাণ বাড়িয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করেছিল। এটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪–৫ শতাংশ। ফলে সমুদ্রপথে পরিবহন পরিস্থিতির অবনতি হলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রফতানি অব্যাহত রাখতে পেরেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রফতানিকারক দেশটি।

কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ পাইপলাইন

হামলায় পাইপলাইনটির ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এখনো স্পষ্ট নয়। এটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা নিয়েও বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, পাইপলাইনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে আরেকটি সূত্র বলেছে, এর আগেই পাইপলাইনটির কার্যক্রম পুনরায় শুরু হতে পারে।

সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিয়াদ ও মদিনার আশপাশে দুটি এলাকায় পাইপলাইনে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি, ড্রোনগুলো ইরানের সীমান্তসংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকের মায়সান প্রদেশ থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি রয়েছে।

এর আগে মার্চে ইয়ানবুতে সৌদি আরামকো-এক্সনমোবিল শোধনাগারের কাছে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে লোহিত সাগরের বন্দরটি থেকে অপরিশোধিত তেল পরিবহন সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসে। ওই ঘটনা এটিই স্পষ্ট করে যে, সৌদির পশ্চিমাঞ্চলের তেল অবকাঠামোও হামলার ঝুঁকির বাইরে নয়।

বৈশ্বিক তেলের বাজারে এ পাইপলাইন কেন গুরুত্বপূর্ণ

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ হওয়া মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশের বেশি—প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল—হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রণালিটি দিয়ে দৈনিক প্রায় ৬০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থাৎ সরবরাহের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমেছে।

এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব লোহিত সাগরমুখী তেল পরিবহন বাড়িয়েছে। তবে এ তেল পরিবহন ও রফতানি অনেকাংশেই পাইপলাইন, মজুদাগার এবং নিরাপদে চলাচলকারী ট্যাংকারের ওপর নির্ভরশীল। ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এসব অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থাও হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে।

রয়টার্সের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পাইপলাইনটি বন্ধ থাকলে ইয়ানবুতে থাকা মজুদ দিয়ে প্রায় পাঁচ থেকে সাত দিন রফতানি চালু রাখা সম্ভব। এছাড়া সৌদি তেল সংরক্ষণকারী মিসরের আইন সুখনা ও সিদি কেরির স্থাপনাগুলো থেকেও কয়েক দিনের অতিরিক্ত সরবরাহ পাওয়া যেতে পারে।

এতে সৌদি আরব কিছুটা সময় পেলেও বৈশ্বিক তেলের মজুদ এরই মধ্যে কমে আসছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, হরমুজ ও লোহিত সাগরে সরবরাহ বিঘ্নের কারণে আগস্টে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস, চলতি বছর বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫৭ লাখ ব্যারেল কমতে পারে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ।

এখন পর্যন্ত কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার পাশাপাশি বাজারে থাকা মজুদের কারণে তেলের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ছিল। তবে আঞ্চলিক সরবরাহ সংকট যত দীর্ঘ হবে, মজুদ তত কমবে এবং তেলের দাম বাড়ার চাপও তত বাড়বে।

তেলের সরবরাহ ও দাম নিয়ে শঙ্কা

জুনে আইইএ জানিয়েছিল, মজুদ থেকে তেল উত্তোলন অব্যাহত থাকলে তা সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মজুদ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছতে পারে।

আর পাইপলাইনের বড় আকারের ক্ষয়ক্ষতি হলে এবং ইয়ানবু ও এর পরবর্তী নৌপথে হামলার ঝুঁকি অব্যাহত থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হারানো তেল রফতানির ঘাটতি পূরণে সৌদি আরবের সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গাভেকাল রিসার্চ বলেছে, বর্তমানে বৈশ্বিক পরিশোধন সক্ষমতা সংকটজনক পর্যায়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম ইয়ানবু হুথিদের ড্রোন হামলার হুমকির কারণে বন্ধ হয়ে গেলে, তা বিশ্বের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।